একসঙ্গে সময় কাটানোর মুহূর্তে মুঠোফোন ব্যবহার বন্ধ বা সীমিত করলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ আরও স্বাভাবিক, গভীর ও অর্থবহ হয়ে ওঠে এমন তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। আধুনিক জীবনে স্মার্টফোন মানুষের দৈনন্দিন কাজকে সহজ করলেও পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি অনেক সময় অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে গবেষণাটি নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তির বাইরে গিয়েও মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ভিভো ইন্ডিয়ার পরিচালিত ‘সুইচ অফ স্টাডি ২০২৫’ শীর্ষক এই গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯১ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় ফোন সরিয়ে রাখলে আলাপচারিতা আরও সহজ হয় এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ে। তাঁদের মতে, ফোন হাতে থাকলে কথোপকথন বারবার ব্যাহত হয়, মনোযোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং আবেগের প্রকাশ ঠিকভাবে হয় না। বিপরীতে ফোন ছাড়া সময় কাটালে পরিবারের সদস্যরা একে অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার সুযোগ পান।

গবেষণায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে রাতের খাবারের সময়ের গুরুত্ব। ব্যস্ত কর্মজীবন, পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত কাজের চাপে দিনের অন্য সময়গুলোতে পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়লেও ডিনার টেবিল এখনো এমন একটি জায়গা, যেখানে সবাই স্বাভাবিকভাবেই একত্রিত হয়। জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের ৭২ শতাংশ জানিয়েছে, তারা মা–বাবার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সময় কাটায় রাতের খাবারের সময়ই। এই সময়টি তাদের কাছে শুধু খাবার খাওয়ার মুহূর্ত নয়, বরং সারাদিনের গল্প ভাগ করে নেওয়ার একটি নিরাপদ জায়গা।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৮৭ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, মুঠোফোন ছাড়া খাবারের সময় কথা বলতে তাঁরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ফোন না থাকলে পরিবারের সদস্যরা চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন, হাসি–ঠাট্টা করতে পারেন এবং একে অন্যের অনুভূতি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন। অন্যদিকে ৮১ শতাংশ অভিভাবকের মতে, নিয়মিত ফোনমুক্ত ডিনার পরিবারের মধ্যে বিশ্বাস, সম্মান ও মানসিক ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে সহায়তা করে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক যোগাযোগের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে পরিবারের সদস্যরা দিনের শেষে একসঙ্গে বসে গল্প করতেন, সেখানে এখন অনেক সময় সবাই আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ডুবে থাকেন। তবু রাতের খাবারের সময়টি এখনো পরিবারের সদস্যদের একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একটি শক্তিশালী সুযোগ তৈরি করে। তবে এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগে তখনই, যখন খাবারের টেবিলে ফোনের নোটিফিকেশন, কল বা সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রলিং আলোচনার জায়গা দখল করে নেয় না।

এই গবেষণার ফলাফলের আলোকে ভিভো ইন্ডিয়া শুরু করেছে তাদের ‘সুইচ অফ’ প্রচারণার সপ্তম সংস্করণ। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো খাবারের টেবিলে পারিবারিক সংযোগ ফিরিয়ে আনা এবং মানুষকে সচেতন করা কিছু সময়ের জন্য হলেও ফোন থেকে দূরে থাকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে। প্রচারণায় দেখানো হয়েছে, কীভাবে স্মার্টফোন ধীরে ধীরে পারিবারিক যোগাযোগের ধরন বদলে দিয়েছে এবং কীভাবে সামান্য সচেতন সিদ্ধান্ত এই পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

প্রচারণার অংশ হিসেবে ‘দ্য লাউডেস্ট ডাইনিং টেবিলস আর দ্য হ্যাপিয়েস্ট’ শিরোনামে একটি নতুন ডিজিটাল ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। ভিডিওটিতে একই ডাইনিং টেবিলের দুটি ভিন্ন দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। এক দৃশ্যে পরিবারের সদস্যরা নীরবে নিজ নিজ ফোনে ব্যস্ত, চোখে কোনো যোগাযোগ নেই। অন্য দৃশ্যে দেখা যায় প্রাণবন্ত পরিবেশ হাসি, গল্প, ঠাট্টা, প্লেট ও চামচের শব্দে ভরা এক উষ্ণ মুহূর্ত। ভিডিওটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, খাবারের টেবিলের কোলাহল কোনো বিশৃঙ্খলা নয়; বরং তা পারিবারিক উপস্থিতি, আনন্দ ও সংযোগেরই প্রতিফলন।

সার্বিকভাবে এই গবেষণা ও প্রচারণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও পারিবারিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে নিয়মিত কিছু সময় ‘সুইচ অফ’ করে একে অন্যের সঙ্গে সত্যিকারের সংযোগ গড়ে তোলা জরুরি। রাতের খাবারের টেবিল হতে পারে সেই সংযোগের সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর সূচনা বিন্দু।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version