অ্যাপল ওয়াচসহ বিভিন্ন পরিধানযোগ্য ডিভাইস থেকে সংগৃহীত বিপুল স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ করে মানুষের কিছু জটিল শারীরিক সমস্যার আগাম ইঙ্গিত দিতে সক্ষম একটি নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল তৈরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) ও এম্পিরিক্যাল হেলথের গবেষকেরা। প্রায় ৩০ লাখ ‘পারসন ডে’ বা ব্যক্তিপ্রতি দৈনিক তথ্যের সমপরিমাণ ডেটা ব্যবহার করে এই মডেলটি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, বাস্তব জীবনে স্বাস্থ্যতথ্য প্রায়ই অসম্পূর্ণ ও অনিয়মিত হয় সেই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যদি এআই কার্যকর বিশ্লেষণ করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের চিকিৎসাব্যবস্থায় এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

এই মডেলের মূল ভিত্তি হলো জয়েন্ট এমবেডিং প্রেডিকটিভ আর্কিটেকচার বা জেপা। ধারণাটি প্রস্তাব করেছিলেন মেটার সাবেক প্রধান এআই বিজ্ঞানী ইয়্যান লেকান। প্রচলিত অনেক এআই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট মান বা লেবেল অনুমান করাকে শেখার কেন্দ্রবিন্দু ধরা হয়। কিন্তু জেপা পদ্ধতিতে তথ্যের গভীর অর্থ, প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ গঠন বোঝার ওপর জোর দেওয়া হয়। ফলে মডেল শুধু সংখ্যাগত পূর্বাভাস নয়, বরং তথ্যের মধ্যে থাকা সম্পর্ক ও প্যাটার্ন ধরতে শেখে। ২০২৩ সালে মেটা জেপা-ভিত্তিক ‘আই জেপা’ মডেল উন্মোচনের সময় জানায়, এই কাঠামো এআইকে দ্রুত শেখা, জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এর পর থেকেই জেপাভিত্তিক গবেষণা তথাকথিত ‘ওয়ার্ল্ড মডেল’ ধারণার দিকে এআই গবেষণাকে নতুন পথে নিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ইয়্যান লেকান মেটা ছেড়ে এই ধারণাকে সামনে রেখে নতুন একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গঠনের ঘোষণাও দিয়েছেন।

এমআইটি ও এম্পিরিক্যাল হেলথের গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘জেটস: আ সেলফ-সুপারভাইজড জয়েন্ট এমবেডিং টাইম সিরিজ ফাউন্ডেশন মডেল ফর বিহেভিয়ারাল ডেটা ইন হেলথকেয়ার’ শিরোনামে। নিউরোআইপিএস সম্মেলনের একটি কর্মশালায়ও এটি গৃহীত হয়েছে। এখানে ‘জেটস’ নামের মডেলটি মূলত জেপা কাঠামোকে সময়ভিত্তিক স্বাস্থ্যতথ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছে, যাতে ওয়্যারেবল ডিভাইস থেকে পাওয়া অনিয়মিত, খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ ডেটাও অর্থবহভাবে বিশ্লেষণ করা যায়।

এই গবেষণায় অংশ নেন মোট ১৬ হাজার ৫২২ জন ব্যক্তি। তাঁদের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্যের পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ পারসন ডে। প্রতিদিন বা তার চেয়েও কম ঘনত্বে ৬৩ ধরনের টাইম সিরিজ ডেটা সংগ্রহ করা হয়। এসব তথ্য পাঁচটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তসংবহন ব্যবস্থা, শ্বাসপ্রশ্বাস, ঘুম, শারীরিক কার্যকলাপ এবং সাধারণ শারীরিক পরিসংখ্যান। তবে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, অংশগ্রহণকারীদের মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশের তথ্যের সঙ্গে চিকিৎসা নথি বা রোগসংক্রান্ত লেবেল যুক্ত ছিল। প্রচলিত সুপারভাইজড মেশিন লার্নিং পদ্ধতিতে এই সীমিত লেবেলড ডেটা দিয়ে পুরো ডেটাসেট ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব হতো।

এই সমস্যার সমাধানে জেটস প্রথম ধাপে সব অন-লেবেলড তথ্য থেকেই নিজে নিজে শেখে, যাকে সেলফ-সুপারভাইজড লার্নিং বলা হয়। পরে সীমিত লেবেলযুক্ত তথ্য ব্যবহার করে মডেলটিকে আরও সূক্ষ্মভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে রোগ শনাক্তের পূর্বাভাস আরও নির্ভুল হয়। গবেষকেরা প্রতিটি তথ্যকে তিনটি উপাদানে ভাগ করেছেন দিন, পরিমাপের মান এবং পরিমাপের ধরন। এরপর এসব উপাদানকে একেকটি ‘টোকেন’-এ রূপান্তর করা হয়। প্রশিক্ষণের সময় কিছু টোকেন ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করে মডেলকে সেই অনুপস্থিত তথ্য অনুমান করতে বলা হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মডেল ধীরে ধীরে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সূচকের মধ্যে সম্পর্ক ও দীর্ঘমেয়াদি প্যাটার্ন বুঝতে শেখে।

পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, উচ্চ রক্তচাপ শনাক্তে জেটস মডেলের এইউআরওসি স্কোর ৮৬ দশমিক ৮ শতাংশ, অ্যাট্রিয়াল ফ্লাটার শনাক্তে ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ, ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোমে ৮১ শতাংশ এবং সিক সাইনাস সিনড্রোম শনাক্তে আবারও ৮৬ দশমিক ৮ শতাংশ স্কোর অর্জিত হয়েছে। গবেষকেরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এইউআরওসি বা এইউপিআরসি কোনো মডেলের শতভাগ নির্ভুলতা নির্দেশ করে না। বরং এটি দেখায়, একটি মডেল কতটা দক্ষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ রোগী বা কেসগুলোকে শনাক্ত ও অগ্রাধিকারভিত্তিতে সাজাতে পারে।

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অ্যাপল ওয়াচের মতো ডিভাইস থেকে পাওয়া অত্যন্ত খণ্ডিত ও অনিয়মিত তথ্য দিয়েও কার্যকর স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশ্লেষণ সম্ভব হয়েছে। কোনো কোনো স্বাস্থ্য সূচক পুরো ডেটাসেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ দিনে রেকর্ড করা হলেও, আবার কিছু সূচক প্রায় প্রতিদিনই পাওয়া গেছে। এই ধরনের অসম ডেটা থাকা সত্ত্বেও জেটস মডেল নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দিতে পেরেছে। গবেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে যদি দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ওয়্যারেবল ডিভাইসের তথ্য আরও উন্নতভাবে বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে রোগের আগাম শনাক্তকরণ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version