আজকের দিনে স্মার্টফোন আমাদের জীবনের অপরিহার্য সঙ্গী। যোগাযোগ, কাজ, বিনোদন, ছবি তোলা, ভিডিও দেখা সব কিছুই আমরা ফোনের মাধ্যমে করি। কিন্তু একটা অভিযোগ প্রায় সবাই করেন ফোনের ডেটা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায় আর ব্যাটারি ঠিকমতো টিকে না।

অনেকে ভাবেন, হয়তো ফোনে সমস্যা আছে বা চার্জার ঠিকমতো কাজ করছে না। কিন্তু আসল কারণ অনেক সময় লুকিয়ে থাকে ফোনের ভেতরে থাকা অ্যাপগুলোতে। কিছু অ্যাপ ব্যবহারকারীর অজান্তেই ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করতে থাকে, যার ফলে ডেটা ও ব্যাটারি দুই-ই দ্রুত শেষ হয়ে যায়।

চলুন জেনে নিই, কোন কোন কারণে আপনার ফোনের ডেটা ও চার্জ এত দ্রুত শেষ হয়ে যায়।

১. ব্যাকগ্রাউন্ডে চালু থাকা অ্যাপ

আমরা যখন কোনো অ্যাপ বন্ধ করি, মনে করি সেটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে চালু থেকেই যায়। যেমন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, নিউজ অ্যাপ বা ইমেইল সেবা। এগুলো সারাক্ষণ সার্ভারের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং নতুন তথ্য নামায়। ফলে ডেটা খরচ হয় এবং প্রসেসরের ওপর চাপ পড়ে। এর কারণে চার্জও দ্রুত ফুরিয়ে যায়।

২. লোকেশন সার্ভিস

গুগল ম্যাপস, ওয়েজ কিংবা অন্যান্য নেভিগেশন অ্যাপ নিয়মিত আপনার অবস্থান ট্র্যাক করে। এ জন্য ফোনকে স্যাটেলাইট ও টাওয়ারের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করতে হয়। এর ফলে প্রচুর ব্যাটারি শেষ হয়ে যায়। আবার এ ধরনের অ্যাপ ট্রাফিক বা রাস্তার অবস্থা জানাতে সারাক্ষণ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যা ডেটা খরচও বাড়িয়ে দেয়।

৩. ভিপিএন ব্যবহার

ভিপিএন ব্যবহার করলে ইন্টারনেট নিরাপদ হয়, কিন্তু খরচও বাড়ে। কারণ ভিপিএন প্রতিটি ডেটা প্যাকেট এনক্রিপ্ট করে পাঠায়। এর ফলে ডেটা খরচ সাধারণ অবস্থার চেয়ে ৪% থেকে ২০% বেশি হয়। তাই অপ্রয়োজনীয় সময়ে ভিপিএন চালু রাখলে ডেটা দ্রুত ফুরিয়ে যায়।

৪. নোটিফিকেশন

আজকাল প্রায় সব অ্যাপই নোটিফিকেশন পাঠায়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জার বা জিমেইল দিনে বহুবার নোটিফিকেশন দেয়। এর জন্য অ্যাপগুলোকে সারাক্ষণ সক্রিয় থাকতে হয়। ফলে ডেটা ও ব্যাটারি দুটোই খরচ হয়। শুধু তা-ই নয়, ফোন বারবার জ্বলে ওঠা বা কম্পন দেওয়াতেও চার্জ দ্রুত শেষ হয়।

৫. ভিডিও ও গান স্ট্রিমিং অ্যাপ

ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, ডিজনি+ বা স্পটিফাইয়ের মতো অ্যাপ প্রচুর ডেটা খরচ করে। যেমন, স্পটিফাইতে গান শোনার সময় ডেটা খরচ হয় ০.৭২ এমবি থেকে ৯.৭ এমবি পর্যন্ত, যা গানের মানের ওপর নির্ভর করে। আবার এসব অ্যাপ অনেক সময় ব্যাকগ্রাউন্ডেও সক্রিয় থাকে, যাতে আপনার প্লেলিস্ট সব সময় সিঙ্ক থাকে। এতে চার্জও কমে যায়। তবে চাইলে ডেটা সেভার মোড ব্যবহার করে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

৬. অটো প্লে ভিডিও

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করার সময় লক্ষ্য করেছেন, স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ ভিডিও চালু হয়ে যায়। এটিই অটো প্লে ফিচার। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবে এই সুবিধা চালু থাকে ডিফল্টভাবে। ফলে আপনি না চাইলেও ভিডিও চালু হয়ে ডেটা খরচ হয় এবং প্রসেসরের ওপর চাপ পড়ে।

৭. স্বয়ংক্রিয় অ্যাপ আপডেট

গুগল প্লে স্টোরে অনেক সময় অ্যাপগুলো নিজে নিজেই আপডেট হয়। আপডেট নামানোর সময় প্রচুর ডেটা ব্যবহার হয়। বিশেষ করে যদি একসঙ্গে অনেক অ্যাপ আপডেট হতে থাকে, তবে ডেটা তো শেষ হবেই, ব্যাটারিও দ্রুত খরচ হয়ে যাবে।

৮. ক্ষতিকর বা ভুয়া অ্যাপ

সব অ্যাপই নিরাপদ নয়। অনেক সময় ক্ষতিকর অ্যাপ প্লে স্টোর ফাঁকি দিয়ে ফোনে ঢুকে পড়ে। এগুলো প্রথমে স্বাভাবিক মনে হলেও পরে ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রচুর ডেটা খরচ করতে থাকে। একই সঙ্গে ফোনের চার্জও দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তাই সব সময় বিশ্বস্ত উৎস থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করা উচিত।

কীভাবে সমাধান করবেন?

👉 যেহেতু সমস্যার মূল কারণ অ্যাপ ও কিছু সেটিংস, তাই কয়েকটি সহজ উপায় মেনে চললেই ডেটা ও ব্যাটারির অপচয় অনেকটাই কমানো যায়

অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ মুছে ফেলুন।

ব্যাকগ্রাউন্ড ডেটা ব্যবহারের অনুমতি সীমিত করুন।

লোকেশন সার্ভিস কেবল প্রয়োজন হলে চালু করুন।

ভিপিএন ব্যবহার না করলে বন্ধ রাখুন।

সোশ্যাল মিডিয়া বা ইউটিউবে অটো প্লে বন্ধ করুন।

অ্যাপ আপডেটের জন্য “ওয়াইফাই অনলি” অপশন চালু রাখুন।

নোটিফিকেশন কাস্টমাইজ করে অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন।

নিয়মিত ফোন চেক করে সন্দেহজনক অ্যাপ সরিয়ে ফেলুন।

ফোনের ডেটা ও ব্যাটারি দ্রুত শেষ হওয়া এখন অনেক ব্যবহারকারীর সাধারণ সমস্যা। তবে মূল কারণগুলো জানলে এবং সেটিংস ঠিকঠাক রাখলে এই সমস্যাকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাই সব সময় সচেতন হয়ে ফোন ব্যবহার করুন, তাহলেই ডেটা ও চার্জ দুটোই অনেকদিন টিকে থাকবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version