আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম জনপ্রিয় অ্যাপ হলো হোয়াটসঅ্যাপ। মেসেজ, ছবি, ভিডিও কিংবা কল সবকিছুর জন্যই আমরা এই অ্যাপের ওপর নির্ভর করি। বিশেষ করে আইফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে এর ব্যবহার অনেক বেশি। কিন্তু সম্প্রতি এমন একটি খবর সামনে এসেছে যা অনেক ব্যবহারকারীর জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কী ঘটছে আসলে?

মেটা জানিয়েছে, হোয়াটসঅ্যাপে একটি গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতা পাওয়া গেছে। এই দুর্বলতার কারণে আইফোন ও ম্যাক ব্যবহারকারীরা এমন এক ধরনের সাইবার হামলার ঝুঁকিতে রয়েছেন, যেটা তারা টেরও পাবেন না। ভয়ংকর বিষয় হলো কোনো লিংকে ক্লিক করা, অজানা ফাইল খোলা বা ডাউনলোড করার প্রয়োজন নেই। আক্রমণকারীরা দূর থেকেই ব্যবহারকারীর ফোনে প্রবেশ করতে পারবে এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে।

এই ত্রুটির নাম কী?

হোয়াটসঅ্যাপের নিরাপত্তা টিম এই সমস্যাটিকে CVE-2025-55177 নামে চিহ্নিত করেছে। প্রযুক্তিগতভাবে এটিকে বলা হচ্ছে “জিরো-ক্লিক এক্সপ্লয়েট”। সাধারণভাবে এর মানে হলো ব্যবহারকারী কোনো কিছু না করলেও (যেমন ক্লিক করা বা ফাইল খোলা), আক্রমণকারীরা ফোনে ঢুকে ক্ষতিকর কোড চালাতে পারে।

কেন এটি এত ভয়ংকর?

অনেক সময় আমরা ফিশিং মেসেজ পাই বা সন্দেহজনক লিংক দেখতে পাই। সেক্ষেত্রে অন্তত সচেতন হয়ে না ক্লিক করার সুযোগ থাকে। কিন্তু “জিরো-ক্লিক এক্সপ্লয়েট” একেবারেই ভিন্ন। এখানে ব্যবহারকারীর কোনো সহযোগিতা লাগে না। আপনার অজান্তেই আক্রমণকারী আপনার ডিভাইস নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম বয়ন্টন বলেন, এই ধরনের আক্রমণ সাধারণ প্রতারণার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। কারণ এতে শুধু সাধারণ তথ্য নয়, পাসওয়ার্ড, গোপন চ্যাট, এমনকি ভবিষ্যতে মুক্তিপণ আদায়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ডেটা ব্যবহার করা হতে পারে। এক কথায়, আপনার ব্যক্তিগত জীবন পুরোপুরি ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে।

কারা টার্গেট হতে পারেন?

হোয়াটসঅ্যাপ জানিয়েছে, এই দুর্বলতাকে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। মানে, সবাই আক্রান্ত হননি। তবে যেহেতু ঝুঁকিটি আইওএস ও ম্যাকওএস ব্যবহারকারীদের জন্য বেশি, তাই সকল আইফোন ব্যবহারকারীরই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

যাদের টার্গেট করা হয়েছে, তারা সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাপের ভেতরে নোটিফিকেশন পাবেন। তবে মনে রাখবেন হোয়াটসঅ্যাপ কোনো সতর্কবার্তা ই-মেইল বা এসএমএসে পাঠাবে না। ফলে কেউ যদি বাইরে থেকে “আপনার হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক হয়েছে” জাতীয় মেসেজ পাঠায়, সেটি অবশ্যই ভুয়া।

নিরাপদ থাকতে যা করবেন

এখন প্রশ্ন হলো আমরা কীভাবে নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারি?

১. হোয়াটসঅ্যাপ আপডেট করুন
সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো, আপনার হোয়াটসঅ্যাপকে সর্বশেষ সংস্করণে আপডেট করা। এই ত্রুটির সমাধান নতুন আইওএস সংস্করণে যুক্ত করা হয়েছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব আপডেট করা ছাড়া উপায় নেই।

২. আইফোন ও ম্যাকের সফটওয়্যার নিয়মিত হালনাগাদ রাখুন
শুধু হোয়াটসঅ্যাপ নয়, আপনার ডিভাইসের পুরো অপারেটিং সিস্টেমও আপডেট রাখা জরুরি। এতে নিরাপত্তা অনেক বেড়ে যায়।

৩. অজানা লিংক বা ফাইল এড়িয়ে চলুন
যদিও এই ত্রুটির ক্ষেত্রে কোনো কিছু ক্লিক করার প্রয়োজন নেই, তবুও নিরাপত্তার জন্য অচেনা লিংক বা ফাইল খোলা থেকে বিরত থাকুন।

৪. টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন চালু করুন
হোয়াটসঅ্যাপে টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন ফিচার চালু করলে আপনার অ্যাকাউন্টে বাড়তি সুরক্ষা যোগ হবে।

৫. সতর্ক থাকুন
কোনো অস্বাভাবিক নোটিফিকেশন বা ফোনের অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

কেন সচেতন থাকা জরুরি?

আমরা অনেক সময় ভাবি “আমি তো সাধারণ ব্যবহারকারী, আমার তথ্য দিয়ে কার কী লাভ হবে?” কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আপনার ব্যক্তিগত ছবি, মেসেজ, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য কিংবা অফিসের কাজ সবই আক্রমণকারীর কাছে মূল্যবান হতে পারে। তারা চাইলে এসব ব্যবহার করে প্রতারণা, চাঁদাবাজি এমনকি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতিও করতে পারে।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু এর সঙ্গে বেড়েছে ঝুঁকিও। হোয়াটসঅ্যাপের সাম্প্রতিক এই সমস্যা আবার মনে করিয়ে দিল ডিজিটাল দুনিয়ায় নিরাপদ থাকতে হলে সচেতন থাকা ছাড়া বিকল্প নেই।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version