স্মার্টফোন এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ অফিস, পড়াশোনা, বিনোদন, যোগাযোগ সবই এক ছোঁয়ায়। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, দিনে কতবার ফোন আনলক করছেন? অনেকেই হয়তো সংখ্যা ১০–২০ ভাবেন, কিন্তু বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক মানুষ দিনে ৮০–১০০ বার পর্যন্ত ফোন আনলক করেন, এবং এ সংখ্যা যদি নিয়মিতভাবে ১০০–১১০-এর বেশি হয়, তাহলে তা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাজ্যের নটিংহ্যাম ট্রেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কেইমিয়ং বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে

  • দিনে ১০০ বারের বেশি ফোন আনলক করলে মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে শুরু করে,

  • ১১০ বারের বেশি হলে কাজের স্মৃতি ও নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা কমতে থাকে,

  • আর আনলকের সংখ্যা ১৫০-এর কাছাকাছি পৌঁছালে ক্ষতির প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়।

নোটিফিকেশনের প্রতি মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া

ফোনের প্রতিটি নোটিফিকেশন একটি শব্দ, আলো ঝলক, কিংবা ছোট্ট পপআপ মস্তিষ্কে ডোপামিনের মতো উত্তেজনা তৈরি করে। তাই মানুষ বারবার ফোন চেক করতে বাধ্য হয়, এমনকি নোটিফিকেশন না এলেও অনেকে অভ্যাসবশত আনলক করে বসেন।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনা লেম্বকি বলেন, স্মার্টফোন মস্তিষ্কে আসক্তির মতো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ফোন কাছে না থাকলে অনেকের মধ্যেই অস্বস্তি, অস্থিরতা বা ‘ফাঁকা লাগা’ অনুভূতি দেখা যায়। অর্থাৎ, ফোন মস্তিষ্কে এক ধরনের বাহ্যিক নির্ভরতা গড়ে তোলে।

ফোন চোখের সামনে না থাকলেও মনোযোগে প্রভাব

বেশির ভাগ মানুষের ধারণা ফোন চাক্ষুষ না দেখলেই মনোযোগ ঠিক থাকে। কিন্তু গবেষণা বলছে, ফোন যদি টেবিলের পাশে থাকে কিংবা ব্যাগে রাখা থাকে, তাহলেও মস্তিষ্কের একটি অংশ অজান্তেই ফোনের দিকে টেনে রাখে। ফলে

  • কাজের প্রতি পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়,

  • সৃজনশীলতা কমে যায়,

  • সমস্যা সমাধানের দক্ষতা দুর্বল হয়,

  • দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা দেখা দেয়।

যন্ত্রনির্ভর স্মৃতি ও চিন্তা

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জ্যোতি কাপুর জানান, আগে মানুষ বই পড়ে, ভেবে, বিশ্লেষণ করে তথ্য গ্রহণ করত। এখন যেকোনো প্রশ্নের উত্তর গুগলে কয়েক সেকেন্ডে পেয়ে যাওয়ায় মস্তিষ্কের ‘তথ্য খোঁজার’ প্রক্রিয়া কম সক্রিয় হয়ে পড়ছে। এর ফলে

  • স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়,

  • বিশ্লেষণক্ষমতা দুর্বল হয়,

  • জ্ঞান অর্জনের এক বড় অংশ যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ে।

অনলাইন শিক্ষার যুগে চ্যালেঞ্জ আরও বাড়ছে

অনলাইন পড়াশোনা, ভার্চুয়াল ক্লাস, সুলভ ডেটা সব মিলিয়ে ফোনের ওপর নির্ভরতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। শ্রেণিকক্ষে বা লাইব্রেরিতে দীর্ঘসময় মনোযোগ ধরে রাখা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই পরিস্থিতি এখন কর্মক্ষেত্রেও

  • মিটিংয়ের মাঝেই ফোন চেক করার প্রবণতা

  • প্রয়োজনীয় তথ্য মনে রাখতে সমস্যা

  • কাজের সময় মনোযোগ বিচ্ছিন্নতা
    এগুলো এখন সাধারণ বিষয় হয়ে উঠছে।

কীভাবে কমাবেন ফোনের প্রভাব?

গবেষকদের মতে, মাত্র দুই–তিন সপ্তাহ সচেতনভাবে চেষ্টা করলেই ফোন ব্যবহারের অভ্যাস বদলানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা কিছু সহজ অভ্যাস পরামর্শ দেন—

  • পড়াশোনা বা কাজের সময় ফোন দূরে রাখা,

  • ঘুমানোর কমপক্ষে এক ঘণ্টা আগে ফোন বন্ধ বা দূরে রাখা,

  • খাওয়ার সময় ফোন ব্যবহার না করা,

  • অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা,

  • স্ক্রিন টাইম ট্র্যাকিং অ্যাপ ব্যবহার করা।

আপনি দিনে কতবার ফোন আনলক করেন একবার হিসাব করে দেখুন। সংখ্যাটি যদি বেশি হয়, এখনই কিছু অভ্যাস বদলানো শুরু করুন। ফোন আমাদের সাহায্য করার জন্য, নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version