সৌদি আরব তার অর্থনীতিকে তেলের ওপর নির্ভরতা থেকে সরিয়ে নতুন খাতে বৈচিত্র্য আনতে গত এক বছরে গেমিং শিল্পে ৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। আন্তর্জাতিক গেমিং হাব হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতেই এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘ভিশন ২০৩০’–এর অংশ হিসেবেই গেমিং খাতে দেশটির এই অগ্রযাত্রা, যেখানে মহামারির সময় দ্রুত বেড়ে ওঠা বৈশ্বিক গেমিং বাজারকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ফিনান্সিয়াল টাইমসের তথ্যমতে, ৮ বিলিয়ন ডলারের এই বিনিয়োগ আসলে মোট ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজেটের একটি ছোট অংশ, যা সৌদি আরবকে বৈশ্বিক গেমিং কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারি বিনিয়োগ তহবিলের গেমিং শাখা Savvy Games Group এবং যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় সহযোগিতায় এই ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে।

গেমিং শিল্প উন্নয়নের জন্য সৌদি আরব একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল নির্ধারণ করেছে, যেখানে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ই-স্পোর্টস ও প্রতিযোগিতামূলক গেমিং। এই সেক্টর থেকে দেশের মোট জিডিপির কমপক্ষে ১% অবদান রাখা, প্রায় ৪০,০০০ নতুন চাকরি তৈরি করা এবং কমপক্ষে ৩০টি নতুন গেম প্রকাশ করার লক্ষ্য রয়েছে। দেশের ৬৫% জনগণ ৩০ বছরের কম হওয়ায়, ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারের বিস্তারের সঙ্গে মিলিয়ে গেমিংকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির শক্তিশালী খাত হিসেবে দেখছে সরকার।

বিশ্বের বড় গেমিং কোম্পানিগুলোর শেয়ার যেমন নিনটেন্ডো ও অ্যাক্টিভিশন ব্লিজার্ড কৌশলগতভাবে ক্রয় করে সৌদি আরব ইতিমধ্যে বৈশ্বিক গেমিং অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে শুরু করেছে। এসব পদক্ষেপই দেখায় যে তারা এই শিল্পে দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়।

তবে, এগিয়ে যাওয়ার পথে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। Savvy Games Group-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান Nine66-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের শেষ নাগাদ স্থানীয় গেমিং স্টার্টআপের সংখ্যা ২৪-এ পৌঁছালেও যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ তাদের বেশিরভাগই এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সীমিত অভিজ্ঞতা, ছোট কর্মী দল এবং আয়ের ঘাটতি এখনো বড় বাধা। এছাড়া নারীদের উপস্থিতি মাত্র ৩২%, যা লিঙ্গ-বৈচিত্র্য বাড়ানোর আরও প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।

গেমিং শিল্পে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিযোগিতাও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ২০২৭ সালের মধ্যে গেমিং আয় ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সৌদির বড় বাজার ও বিশাল আর্থিক সক্ষমতা তাদের এগিয়ে রাখলেও, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও আঞ্চলিক প্রভাবের কারণে ইউএইও বৈশ্বিক গেমিং কোম্পানিগুলোর কাছে খুবই আকর্ষণীয় গন্তব্য।

সবকিছু মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, গেমিং খাতে সৌদি আরবের অগ্রগতি দ্রুতই এগোচ্ছে। বৈশ্বিক কোম্পানি ও স্থানীয় ডেভেলপারদের প্রতি সরকারের ধারাবাহিক বিনিয়োগ এই শিল্পকে আরও ত্বরান্বিত করবে। ভিশন ২০৩০–এর লক্ষ্য অনুযায়ী অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য আনতে গেমিং একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

যদিও বাধা-প্রতিকূলতা রয়েছে, তারপরও স্থানীয় উদ্যোক্তা ও গেমিং কোম্পানিগুলোর অধিকাংশই ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী যা অ্যাস্ট্রোল্যাবসের সাম্প্রতিক জরিপেও প্রমাণিত। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নিজে এই প্রকল্পের তদারকি করছেন বলেই অনেকের বিশ্বাস, গেমিং শিল্প সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে নতুন রূপ দিতে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version