অনেক ব্যবহারকারীই ঘরের ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক চালু করার পর বছরের পর বছর একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন। শুরুতে বিষয়টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলেও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভ্যাস ধীরে ধীরে বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই এখন আমাদের স্মার্টফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, এমনকি ঘরের অনেক স্মার্ট ডিভাইস ইন্টারনেটে যুক্ত থাকে। তাই পাসওয়ার্ড দীর্ঘদিন না বদলালে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, তা সহজভাবে জানা জরুরি।

প্রথমত, নেটওয়ার্কে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একটি পাসওয়ার্ড যদি অনেকদিন অপরিবর্তিত থাকে, তবে সেটি ধীরে ধীরে অন্যের কাছে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কখনো আত্মীয়, বন্ধু বা প্রতিবেশী কাউকে পাসওয়ার্ড দেওয়া হয়েছিল, আবার কেউ হয়তো একবার অনুমান করেই নেটওয়ার্কে ঢুকে গেছে। একবার কেউ ঢুকে পড়লে ব্যবহারকারীর অজান্তেই সে দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে একাধিক অচেনা ডিভাইস যুক্ত হলে ব্যান্ডউইথ ভাগ হয়ে যায়। এর ফলে ভিডিও স্ট্রিমিং করতে গেলে বারবার বাফারিং হয়, অনলাইন ক্লাস বা মিটিংয়ের সময় সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অনলাইন গেম খেলতে গিয়ে বিরক্তিকর ল্যাগ দেখা দেয়। অনেক সময় ব্যবহারকারী বুঝতেই পারেন না কেন ইন্টারনেট হঠাৎ ধীর হয়ে গেছে।

তৃতীয়ত, সামগ্রিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে। পুরোনো বা সহজ পাসওয়ার্ড আধুনিক হ্যাকিং টুলের মাধ্যমে সহজেই ভেঙে ফেলা সম্ভব। সাইবার অপরাধীরা সাধারণত প্রচলিত পাসওয়ার্ডের ধরন বা আগের কোনো তথ্য ফাঁস থেকে পাওয়া ডেটা ব্যবহার করে নেটওয়ার্কে ঢোকার চেষ্টা করে। এতে শুধু ইন্টারনেট নয়, নেটওয়ার্কে যুক্ত সব ডিভাইস ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

চতুর্থত, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে কেউ অনুপ্রবেশ করতে পারলে আপনার শেয়ার করা ফাইল, ব্রাউজিং অভ্যাস বা কখনো কখনো লগইন তথ্যও নজরদারির মধ্যে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে রাউটার পুরোনো হলে বা নিয়মিত আপডেট না করলে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

পঞ্চমত, স্মার্ট ডিভাইসের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাবনা থাকে। বর্তমানে অনেক ঘরেই স্মার্ট টিভি, স্মার্ট ক্যামেরা, স্পিকার কিংবা অন্যান্য আইওটি ডিভাইস থাকে, যেগুলো ওয়াই-ফাইয়ের মাধ্যমে চলে। নেটওয়ার্ক নিরাপদ না হলে সাইবার অপরাধীরা এসব ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ম্যালওয়্যার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও থাকে।

ষষ্ঠত, আইনি জটিলতায় পড়ার সম্ভাবনা থাকে। যদি কেউ আপনার ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অবৈধ কিছু ডাউনলোড করে, ভুয়া কাজ বা সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তবে তার দায়ভার আপনার ওপরও আসতে পারে। কারণ সেই ইন্টারনেট সংযোগটি আপনার নামে নিবন্ধিত। অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে যে কাজটি আপনি করেননি।

সবশেষে, রাউটারের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। সাইবার অপরাধীরা নেটওয়ার্কে পর্যাপ্ত অ্যাকসেস পেলে রাউটারের সেটিংসে ঢুকে পাসওয়ার্ড, নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অপশন পরিবর্তন করে দিতে পারে। এতে নেটওয়ার্ক আরও দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের সাইবার হামলার পথ তৈরি হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ড দীর্ঘদিন না বদলানো শুধু ইন্টারনেটের গতি কমায় না, বরং ব্যক্তিগত তথ্য, ডিভাইস এবং আইনি নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে। তাই নির্দিষ্ট সময় পর পর শক্তিশালী ও ভিন্নধর্মী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা এবং রাউটারের নিরাপত্তা সেটিংস হালনাগাদ রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে ঘরের ইন্টারনেট ব্যবহার যেমন নিরাপদ থাকবে, তেমনি মানসিক দুশ্চিন্তাও অনেকটাই কমবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version