আজ শুক্রবার সকালে ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ করে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। অনেকেই ঘুম থেকে উঠে, কেউ অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে বা কেউ বাসার কাজ করতে করতে হালকা কম্পন অনুভব করেন। মুহূর্তটির মধ্যে মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কেউ দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে যান, কেউ আবার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর পরে জানায়, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭ এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী এলাকায়। দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাঝেমধ্যেই এমন ভূমিকম্প অনুভূত হয়। তবে এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও মনে করিয়ে দিল যে ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যার আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
অনেক ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম পূর্বাভাস দেওয়া গেলেও ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে সেই সুবিধা নেই। কারণ ভূমিকম্প হঠাৎ ঘটে এবং এর আগাম কোনো স্পষ্ট সংকেত পাওয়া যায় না। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল শনাক্ত করতে পারলেও কখন ভূমিকম্প হবে সেটি নির্দিষ্ট করে বলা এখনো সম্ভব হয়নি। তবে ভূমিকম্প হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রিয়েল-টাইম সতর্কবার্তা পাঠানোর প্রযুক্তি এখন বেশ উন্নত হয়েছে। গুগলের আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেমসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি অ্যাপ ভূমিকম্পের সময় সেকেন্ডের ব্যবধানে ব্যবহারকারীদের সতর্কবার্তা পাঠাতে পারে।
গুগল ২০২০ সালে তাদের অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেম চালু করে। এই সিস্টেম পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে অ্যান্ড্রয়েড ফোনে থাকা ক্ষুদ্র অ্যাক্সিলোমিটার সেন্সর ব্যবহার করে ভূমিকম্পের কম্পন শনাক্ত করে। স্মার্টফোনে যে সেন্সরগুলো সাধারণত স্ক্রিন ঘোরানোর মতো কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়, সেই একই সেন্সর ভূমিকম্পের সময় মাটির কম্পন রেকর্ড করতে পারে। যখন কোনো এলাকায় একসঙ্গে হাজার হাজার ফোন কম্পন রেকর্ড করে, তখন গুগলের সিস্টেম তাৎক্ষণিকভাবে বুঝে নেয় সেখানে ভূমিকম্প ঘটছে বা ঘটতে যাচ্ছে। এরপর নিকটবর্তী ব্যবহারকারীদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়, যেন তারা নিরাপদ জায়গায় যেতে পারেন।
এই সতর্কবার্তায় শুধু কম্পন সম্পর্কে জানানোই নয়, বরং নিরাপদ থাকতে কী করতে হবে ,যেমন দ্রুত শক্ত কোনো টেবিলের নিচে আশ্রয় নেওয়া, মাথা ঢেকে রাখা, কাঁচের কাছ থেকে দূরে থাকা এসব নির্দেশনাও দিয়ে থাকে। অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা চাইলে সেটিংস থেকে সহজেই এই সুবিধা চালু করতে পারেন। শুধু সেটিংসে গিয়ে সেফটি অ্যান্ড ইমার্জেন্সি অপশন খুলে আর্থকোয়েক অ্যালার্টস চালু করলেই হবে। এরপর কোনো ভূমিকম্প হলে ব্যবহারকারী দ্রুত নোটিফিকেশন পাবেন।
এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় আরেকটি অ্যাপ হলো মাই আর্থকোয়েক অ্যালার্টস। এক কোটিরও বেশি অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারী অ্যাপটি নিয়মিত ব্যবহার করেন। এটি একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ অ্যাপ, যা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবহারকারীর কাছে পাঠায়। অ্যাপটিতে রিয়েল-টাইম আপডেট ছাড়াও আগের ভূমিকম্পগুলোর রেকর্ড, মানচিত্রে কম্পন কেন্দ্রের অবস্থান, মাত্রা, গভীরতা ও টাইমলাইন দেখা যায়। যে কেউ বিনা মূল্যে অ্যাপটি ডাউনলোড করে ব্যবহার করতে পারেন। অ্যাপটির আইওএস সংস্করণও আছে, ফলে আইফোন ব্যবহারকারীরাও প্রয়োজনীয় সতর্কতা পেতে পারেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলে ক্যাম্পাসের বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন আরেকটি কার্যকর অ্যাপ- মাইশেক। এ অ্যাপটিও স্মার্টফোনের সেন্সর ব্যবহার করে ভূমিকম্প শনাক্ত করে এবং রিয়েল-টাইমে ব্যবহারকারীদের সতর্ক করে। মাইশেক শুধু একটি সতর্কবার্তা অ্যাপ নয়; বরং এটি একটি সিটিজেন-সায়েন্স প্রজেক্ট। অর্থাৎ ব্যবহারকারীরা যখন অ্যাপটি ব্যবহার করেন, তখন তাদের ফোন ভূমিকম্প-সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সংগ্রহ করে গবেষকদের কাছে পাঠায়। এতে ভবিষ্যতে ভূমিকম্প পূর্বাভাস প্রযুক্তি উন্নয়ন করতে বিজ্ঞানীরা অনেক সহায়তা পান। প্রায় ১০ লাখের মতো মানুষ অ্যাপটি ব্যবহার করছেন এবং সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে এটি ডাউনলোড করা যায়।
বর্তমান সময়ে ভূমিকম্পের মুহূর্তে সঠিক তথ্য পাওয়া মানুষের জীবনে এক বড় ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ জনসংখ্যার ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকায় সেকেন্ডের আগাম সতর্কবার্তা জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই এসব অ্যাপ ব্যবহার করলে অন্তত ভূমিকম্পের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কিছুটা সুযোগ থাকে। যদিও এগুলো কোনোভাবে ভূমিকম্প থামাতে পারে না, তবে মানুষের অমূল্য জীবন রক্ষায় প্রযুক্তির এই ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
