আজকের দিনে ঘরে বসে পড়াশোনা, অফিসের কাজ, বিনোদন সব কিছুর জন্যই ইন্টারনেট দরকার। অনলাইনে ভিডিও দেখা, গেম খেলা, মিটিং করা বা লাইভ ক্লাস করা সবই নির্ভর করে দ্রুতগতির ইন্টারনেটের ওপর। কিন্তু অনেক সময় ইন্টারনেট কোম্পানির দ্রুতগতির সংযোগ থাকলেও ঘরে ওয়াই-ফাই ব্যবহার করার সময় গতি ধীর হয়ে যায়। এতে বিরক্তি তৈরি হয়, ভিডিও বারবার বাফার করে, অনলাইনে কাজ থেমে যায়।
আসলে ওয়াই-ফাইয়ের গতি কমার পেছনে অনেক কারণ থাকে। তবে কিছু ছোট কৌশল মানলেই ঘরে ওয়াই-ফাই আগের তুলনায় অনেক দ্রুত করা সম্ভব। চলুন দেখে নিই ওয়াই-ফাইয়ের গতি বাড়ানোর সহজ উপায়
১. রাউটার সঠিক জায়গায় রাখুন
রাউটার কোথায় রাখা হয়েছে, সেটির ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে সিগন্যাল কতটা শক্তিশালী হবে। অনেকেই ভুল করে রাউটারকে ঘরের এক কোণে, মেঝের কাছে বা ভারী আসবাবের আড়ালে রাখেন। এতে সংকেত দেয়ালে লেগে দুর্বল হয়ে যায়।
ভালো ফল পেতে হলে রাউটার সবসময় ঘরের মাঝখানে এবং একটু উঁচু জায়গায় রাখতে হবে। খোলা জায়গায় রাখলে সিগন্যাল সহজে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই প্রথমেই খেয়াল রাখতে হবে রাউটার কোথায় রাখা হলো।
২. সংকেতে বাধা এড়ান
ওয়াই-ফাইয়ের সংকেতকে দুর্বল করে অনেক যন্ত্র। যেমন ব্লুটুথ স্পিকার, ওয়্যারলেস ক্যামেরা, মাইক্রোওয়েভ ওভেন বা রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করা ডিভাইস। এসব যন্ত্র রাউটারের কাছে থাকলে সিগন্যাল প্রভাবিত হয়।
তাই চেষ্টা করুন রাউটারকে এসব যন্ত্রপাতি থেকে দূরে রাখতে। আবার আশপাশে যদি একাধিক ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে, তাহলে ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ে ভিড় হয়। এ সময় রাউটারের সেটিংসে গিয়ে চ্যানেল ম্যানুয়ালি পরিবর্তন করুন। কম ভিড়যুক্ত চ্যানেল বেছে নিলে গতি কিছুটা বাড়বে।
৩. আধুনিক রাউটার ব্যবহার করুন
পুরোনো মডেলের রাউটার দিয়ে সবসময় ভালো গতি পাওয়া যায় না। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, নতুন রাউটারগুলোও আরও দ্রুত ও শক্তিশালী হচ্ছে। বর্তমানে ওয়াই-ফাই ৬ বা ওয়াই-ফাই ৬ই প্রযুক্তির রাউটার অনেক জনপ্রিয়। এগুলো ডুয়াল ব্যান্ড বা ট্রাই ব্যান্ড সমর্থিত হয়, ফলে একই সঙ্গে একাধিক ডিভাইসে ভালো গতি দেয়।
যদি আপনার রাউটার অনেক পুরোনো হয়ে যায় বা এসব প্রযুক্তি সমর্থন না করে, তাহলে নতুন রাউটার ব্যবহার করা উচিত। এতে শুধু গতি নয়, নেটওয়ার্কও আরও স্থিতিশীল হবে।
৪. রাউটারের সফটওয়্যার নিয়মিত আপডেট করুন
রাউটারও ছোট্ট এক ধরনের কম্পিউটার, যেটিতে সফটওয়্যার থাকে। এই সফটওয়্যারকে বলা হয় ফার্মওয়্যার। অনেক সময় আমরা মোবাইল বা ল্যাপটপ আপডেট করি, কিন্তু রাউটারের সফটওয়্যার আপডেট করতে ভুলে যাই।
নির্মাতা কোম্পানিগুলো নিয়মিত নতুন আপডেট দেয়, যাতে নিরাপত্তা ও পারফরম্যান্স ভালো হয়। যদি ফার্মওয়্যার আপডেট না করা হয়, তাহলে নেটওয়ার্ক ধীর হতে পারে। তাই রাউটারের সেটিংসে গিয়ে নিয়মিত আপডেট চেক করুন এবং নতুন ভার্সন থাকলে ইনস্টল করুন।
৫. রেঞ্জ এক্সটেন্ডার বা মেশ সিস্টেম ব্যবহার করুন
বড় বাড়িতে বা একাধিক দেয়ালের কারণে অনেক সময় রাউটারের সিগন্যাল একসাথে পুরো ঘরে পৌঁছায় না। ফলে একটি রুমে নেটওয়ার্ক ভালো থাকলেও অন্য রুমে একেবারেই দুর্বল হয়।
এই সমস্যার সমাধান করতে পারেন রেঞ্জ এক্সটেন্ডার ব্যবহার করে। এটি মূল রাউটার থেকে সিগন্যাল নিয়ে আবার ছড়িয়ে দেয়। এছাড়া আরও উন্নত সমাধান হলো মেশ নেটওয়ার্ক। এতে একাধিক ডিভাইস একসাথে কাজ করে পুরো বাড়ি বা অফিসে সমান শক্তির নেটওয়ার্ক দেয়।
৬. নেটওয়ার্ক নিরাপদ রাখুন
অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না, অন্য কেউ আমাদের অনুমতি ছাড়া ওয়াই-ফাই ব্যবহার করছে। এতে গতি ধীর হয়ে যায়।
তাই সবসময় জটিল ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। সাধারণ নাম, জন্মতারিখ বা সহজ সংখ্যা ব্যবহার করবেন না। পাশাপাশি WPA2 বা WPA3 এনক্রিপশন চালু রাখুন। এতে আপনার নেটওয়ার্ক নিরাপদ থাকবে এবং বাইরের কেউ সহজে ব্যবহার করতে পারবে না।
৭. বেশি ডেটা ব্যবহারকারী ডিভাইসে তার ব্যবহার করুন
ওয়াই-ফাই সবার জন্য ভালো, তবে কিছু ডিভাইস অনেক বেশি ডেটা ব্যবহার করে। যেমন স্মার্ট টেলিভিশন, ডেস্কটপ কম্পিউটার বা গেমিং কনসোল। এগুলোতে ভিডিও স্ট্রিমিং বা অনলাইন গেম খেলার সময় ওয়াই-ফাইয়ের ওপর বেশি চাপ পড়ে।
এই সমস্যার সমাধান হলো ইথারনেট ক্যাবল ব্যবহার করা। এসব ডিভাইসে ওয়াই-ফাইয়ের বদলে সরাসরি তার দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করলে গতি আরও স্থিতিশীল হয়। এতে ওয়াই-ফাইয়ের ওপর চাপ কমে যায় এবং অন্য ডিভাইসেও দ্রুতগতির ইন্টারনেট পাওয়া যায়।
ওয়াই-ফাই ধীর হয়ে গেলে অনেকেই ভাবেন, হয়তো ইন্টারনেট কোম্পানির সমস্যা। কিন্তু বেশিরভাগ সময় সমস্যাটা ঘরের ভেতরেই থাকে। রাউটার সঠিক জায়গায় রাখা, আপডেট করা, নিরাপত্তা ঠিক রাখা এবং প্রয়োজনে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে গতি অনেকটা বেড়ে যায়।
তাই আর দেরি না করে এই সহজ ৭টি উপায় অনুসরণ করে দেখুন। দেখবেন আপনার ঘরের ওয়াই-ফাই আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে।
