বাংলাদেশে প্রতি ঈদ, পূজা বা বড় উৎসব এলেই ঘরে ফেরার পথে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বিশেষ করে বিভিন্ন সেতু ও ব্যস্ত সড়কে টোল দিতে গিয়ে তৈরি হয় ভয়াবহ যানজট। নগদ টাকা হাতে হাতে নেওয়ার এই প্রক্রিয়া যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি এতে নষ্ট হয় কোটি কোটি শ্রমঘণ্টা।

পশ্চিমা অনেক দেশে গাড়ি থামানো ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে গাড়িতে থাকা ইলেকট্রনিক ট্যাগ বা সেন্সরের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ফি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো বেশিরভাগ সেতুতে চালকদের হাতে হাতে টাকা দিতে হয়, যা সময় ও ধৈর্যের বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।

ঢাকার কাছে মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহনের চালক আরিয়ান আরিফ বলেন, “গত সপ্তাহে টোল দিতে আমার প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লেগেছে। এমনকি একটি অ্যাম্বুলেন্সও অনেকক্ষণ আটকে ছিল। হাতে হাতে টাকা নেওয়ার কারণে পুরো সড়কে দীর্ঘ লাইন পড়ে গিয়েছিল।”

একই অভিজ্ঞতা জানান সিলেট থেকে ঢাকাগামী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, “ঢাকায় আসতে আমার ১৭ ঘণ্টা লেগেছে, যেখানে সাধারণত ছয় ঘণ্টা লাগে। কয়েকটি সেতুর টোল দিতে গিয়ে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। যদি ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ETC) থাকত, এত কষ্ট হতো না।”

অগাস্টিন সুজন নামের এক গাড়িচালক বলেন, “আমি নিয়মিত পদ্মা সেতু পার হই। এখন পরীক্ষামূলকভাবে ইটিসি চালু হয়েছে দেখে ভালো লাগছে। প্রতিটি সেতুতে ১০ মিনিট করে সময় বাঁচলে, যাত্রার পুরো সময়ই অনেক কমে যাবে।”

পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হলো ইটিসি সেবা

১৫ সেপ্টেম্বর পদ্মা সেতুতে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) ব্যবস্থা। এটি চালু হলে টোল দিতে গাড়ি থামাতে হবে না। নির্দিষ্ট ইটিসি লেন ব্যবহার করে নিবন্ধিত গাড়িগুলো ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩০ কিলোমিটার গতিতে সেতু পার হতে পারবে। তখন গাড়ির প্রি-পেইড অ্যাকাউন্ট থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত টোল কেটে নেওয়া হবে।

এই সেবায় অংশ নিতে চালককে প্রথমে ট্রাস্ট ব্যাংকের “Tap App”-এর “D-Toll” অপশনে গিয়ে গাড়ি নিবন্ধন ও রিচার্জ করতে হবে। এরপর পদ্মা সেতুর আরএফআইডি বুথে একবার যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে, পরবর্তীতে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ি শনাক্ত করবে।

সেতু কর্তৃপক্ষ জানায়, এ ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে টোল প্লাজায় যানজট অনেক কমে যাবে এবং প্রতিদিন হাজারো যাত্রী সময় বাঁচাতে পারবেন।

ভবিষ্যতে সারা দেশে ই-টোল সেবা

সরকার এখন পরিকল্পনা করছে দেশের প্রধান সড়ক ও সেতুতে ধীরে ধীরে ই-টোল সেবা চালু করার। এতে হাতে হাতে টাকা নেওয়ার ঝামেলা থাকবে না এবং নগদ টাকার পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেন সম্ভব হবে।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, “আমরা সারা দেশে ই-টোল চালুর কাজ করছি। পদ্মা সেতুর মতো বড় সেতুগুলোতে ৬০-৮০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে এটাই আমাদের লক্ষ্য।”

তিনি আরও জানান, আগে আরএফআইডি ভিত্তিক ডিজিটাল টোল চালুর চেষ্টা করা হলেও চালকদের আগ্রহ না থাকায় তেমন সফল হয়নি। এখন নতুন পরিকল্পনায় মোবাইল ব্যাংকিং বা অ্যাপের মাধ্যমে টোল দেওয়া যাবে। গাড়ির তথ্য ও ওয়ালেট নম্বর অ্যাপে যুক্ত করলেই টোল কেটে নেওয়া হবে। যাঁদের মোবাইল ওয়ালেট নেই, তাঁরা ভবিষ্যতে কিউআর কোড স্ক্যান করে টোল দিতে পারবেন।

সরকার দীর্ঘমেয়াদে “ইউনিফায়েড টিকেটিং সিস্টেম” চালুর কাজও করছে। এতে বাস, ট্রেন, ট্রাক, বিমানসহ সব ধরনের টিকিট ও টোল সেবা এক প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে। ফলে নাগরিকদের সময় বাঁচবে, হয়রানি কমবে এবং সেবা আরও আধুনিক হবে।

ই-টোল সেবা পুরোপুরি চালু হলে শুধু যানজটই কমবে না, দেশের পরিবহন খাতেও আসবে গতি ও দক্ষতা। এটি হবে বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার এক বড় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version