অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক নিয়ে বাংলাদেশে একটি নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার নাম দেওয়া হচ্ছে ফাইবার ব্যাংক। এটি একটি সফট কনসোর্টিয়াম বা যৌথ প্ল্যাটফর্মের মতো হবে, যেখানে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত ফাইবার অপটিক লাইনকে কাজে লাগিয়ে সারা দেশে ইন্টারনেট সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে।

কেন ফাইবার ব্যাংকের উদ্যোগ

বাংলাদেশে চারটি বড় সরকারি প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি), পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে বছরের পর বছর ধরে বিপুল পরিমাণ ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপন করেছে। কিন্তু এর একটি বড় অংশ ব্যবহার হচ্ছে না। উদাহরণস্বরূপ, বিসিসির ৪৮ কোরের মধ্যে মাত্র ২ কোর ব্যবহার করা হচ্ছে, বাকি ৪৬ কোর ফাঁকা। একইভাবে রেলওয়ে এবং পিজিসিবির অনেক ফাইবার কার্যত অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

এত বড় বিনিয়োগের পরেও যদি এসব নেটওয়ার্ক কাজে না লাগে, তবে কয়েক বছরের মধ্যে সেগুলো অকার্যকর হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে। তাই এসব অব্যবহৃত ফাইবারকে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার আওতায় এনে ব্যবহারযোগ্য করে তুলতেই ফাইবার ব্যাংকের ধারণা এসেছে।

কীভাবে কাজ করবে ফাইবার ব্যাংক

ফাইবার ব্যাংক মূলত একটি শেয়ারড প্ল্যাটফর্ম। অর্থাৎ যেসব সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান ফাইবার ব্যবহার করতে চাইবে, তারা এই ব্যাংক থেকে নিকটবর্তী ফাইবার লাইন ভাড়া নিতে পারবে। সফটওয়্যার সিস্টেম বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করবে কোন জায়গায় কোন ফাইবার খালি আছে এবং কোনটি ব্যবহার করা সবচেয়ে কার্যকর হবে। এরপর সেই ফাইবারের মাধ্যমে সংযোগ দেওয়া হবে।

এর ফলে অব্যবহৃত ফাইবারগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হবে। পাশাপাশি যেসব সরকারি সংস্থার মালিকানায় ফাইবার আছে, তারাও এ থেকে আয় করতে পারবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি বিসিসি ফাইবার ভাড়া দেয়, তবে বিসিসি, বিটিআরসি এবং যারা মেইনটেন্যান্স করবে সবাই আয় ভাগাভাগি করবে।

উদ্যোগের আর্থিক সম্ভাবনা

চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারি সংস্থাগুলোর হাতে বর্তমানে প্রায় ৭৮ হাজার ৪০০ কিলোমিটার ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক আছে। এর প্রায় ৪০ শতাংশ এখনও ব্যবহার হয়নি। যদি এগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে প্রতিবছর শুধু লিজ থেকেই ৫০০ কোটি টাকার বেশি আয় করা সম্ভব।

এছাড়া বিটিসিএলের নেতৃত্বে যৌথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমানো হবে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। আর বেসরকারি এনটিটিএন অপারেটররা যদি এই ব্যাংক থেকে ফাইবার ব্যবহার করে, তবে তাদের ব্যান্ডউইথ খরচও প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

দেশের জন্য সুবিধা

এই উদ্যোগের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন আসতে পারে তা হলো দেশের সব মোবাইল টাওয়ার ফাইবার সংযোগের আওতায় আসবে। বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ মোবাইল টাওয়ার এখনও ফাইবারাইজেশনের বাইরে। ফলে ইন্টারনেটের গতি ও মান উন্নত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাইবার ব্যাংক চালু হলে টাওয়ারগুলো সহজেই ফাইবারে যুক্ত হবে, যা দ্রুত ও সাশ্রয়ী খরচে ফাইভজি চালুর পথ সুগম করবে।

শুধু শহর নয়, ইউনিয়ন পর্যায়েও ১ জিবিপিএস বা তার চেয়ে বেশি গতির ইন্টারনেট দেওয়া সম্ভব হবে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ ঘরে এখনও ফাইবার সংযোগ পৌঁছায়নি। ফাইবার ব্যাংকের মাধ্যমে সাশ্রয়ী খরচে গ্রামে-গঞ্জে উচ্চগতির ইন্টারনেট ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।

অংশগ্রহণকারীরা

প্রাথমিকভাবে এই ফাইবার ব্যাংকে যুক্ত হচ্ছে বিটিসিএল এবং বিসিসি। উদ্যোগটিকে বাস্তবায়ন করতে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাদের কাছে ইতোমধ্যেই চিঠি পাঠানো হয়েছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বাংলাদেশে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক একটি অমূল্য সম্পদ। কিন্তু এ সম্পদ অব্যবহৃত থাকলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতি ডেকে আনবে। অন্যদিকে ফাইবার ব্যাংক বাস্তবায়ন হলে সরকার যেমন রাজস্ব আয় বাড়াতে পারবে, তেমনি বেসরকারি খাতও কম খরচে উন্নতমানের সেবা দিতে পারবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি একটি উইন-উইন সিচুয়েশন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অব্যবহৃত সম্পদ ব্যবহার করে আয় করবে, আবার সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী দামে দ্রুতগতির ইন্টারনেট পাবে। ফলে শিক্ষা, ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে ডিজিটাল সেবার প্রসার ঘটবে।

বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিকম খাতে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে ফাইবার ব্যাংক। বছরের পর বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা ফাইবার নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে জাতীয় সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার এ উদ্যোগ দেশের অর্থনীতি ও ডিজিটাল অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে।

👉 মোটামুটি বলা যায়, ফাইবার ব্যাংক হলে

  • অব্যবহৃত ফাইবার সঠিকভাবে কাজে লাগবে

  • সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো রাজস্ব পাবে

  • রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমবে

  • বেসরকারি অপারেটরদের খরচ কমবে

  • মোবাইল টাওয়ারগুলো দ্রুত ফাইবার সংযুক্ত হবে

  • গ্রামে-গঞ্জে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছাবে

এভাবে ফাইবার ব্যাংক বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version