প্রকৃতি যেন আধুনিক যুগের রোগগুলোর সব উত্তর নিজের ভেতরেই লুকিয়ে রেখেছে। সেই উত্তরগুলোর একটি ইঙ্গিত এখন বিজ্ঞানীরা খুঁজে পাচ্ছেন বিশালাকার প্রাণী তিমির ভেতর। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্তন্যপায়ী এই প্রাণী আমাদের ক্যান্সার ও বার্ধক্য সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিচ্ছে।
জীববিজ্ঞানের এক দীর্ঘদিনের রহস্য হলো “পিটো’স প্যারাডক্স”। সহজভাবে বললে, যত বড় কোনো প্রাণীর দেহ, তার কোষের সংখ্যা তত বেশি হয়। কোষ যত বেশি, তত বেশি ডিএনএ অনুলিপি করতে হয়, আর অনুলিপি যত বেশি হয়, ভুল হওয়ার বা মিউটেশনের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। যেহেতু ডিএনএ মিউটেশন জমে জমে ক্যান্সারের জন্ম দেয়, তাই তত্ত্ব অনুযায়ী বড় প্রাণীদের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার কথা অনেক বেশি। কিন্তু প্রকৃতিতে আমরা দেখি উল্টো চিত্র তিমির মতো বিশাল প্রাণীরা শতবর্ষ ধরে বেঁচে থাকে, অথচ ক্যান্সারের দেখা মেলে খুবই কম।
এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিজ্ঞানীরা একসঙ্গে গবেষণা শুরু করেন। তাদের গবেষণা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ‘Nature’ সাময়িকীতে, যেখানে তারা ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে বোহেড তিমি, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘজীবী স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকে এবং প্রায় কখনোই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় না।
গবেষকরা প্রথমে পরীক্ষা করেন, তিমির কোষ কি মানুষের কোষের তুলনায় মিউটেশনের ক্ষতি ভালোভাবে সামলাতে পারে কি না। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে তিমি ও মানুষের কোষে ক্যান্সার-সম্পর্কিত মিউটেশন ঢুকিয়ে দেখেন, কতগুলো মিউটেশন লাগবে কোষকে ক্যান্সারাস করতে। আশ্চর্যের বিষয়, তিমির কোষ অনেক কম সংখ্যক মিউটেশনেই পরিবর্তিত হয়, তবে তাদের ডিএনএ-তে স্বাভাবিকভাবে ভুল জমে খুব কম। এটি প্রমাণ করে, তিমির শরীরের কোষে এমন একটি উন্নত ডিএনএ-মেরামতি ব্যবস্থা আছে যা মানুষের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।
আরও গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিমির ডিএনএ মানুষের তুলনায় অনেক ধীরগতিতে মিউটেট হয়। সাধারণভাবে ডিএনএ ক্ষতির একটি বড় কারণ হলো “ডাবল-স্ট্র্যান্ড ব্রেক” অর্থাৎ ডিএনএর দুটি সুতাই ছিঁড়ে যাওয়া। সাধারণত শরীর এই ভাঙা অংশ জোড়া লাগায় “নন-হোমোলগাস এন্ড জয়নিং” (NHEJ) নামের একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় যদি ভুল হয়, তাহলে ডিএনএ ঠিকভাবে জোড়া লাগে না, ঠিক যেন ভাঙা আয়না আবার জোড়া লাগানোর পরও তার দাগ থেকে যায়।
তিমির কোষ এই প্রক্রিয়ায় মানুষের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষ। তাদের কোষ শুধু আয়নাকে জোড়া লাগায় না, বরং সেটিকে প্রায় নতুনের মতো করে তোলে। অর্থাৎ, তারা ভাঙা অংশগুলো গলিয়ে এমনভাবে যুক্ত করতে পারে যেন কোনো দাগই না থাকে। এই অতুলনীয় ক্ষমতাই হয়তো তাদের ক্যান্সার থেকে সুরক্ষা দেয় এবং শত বছর পেরিয়েও সুস্থ রাখে।
গবেষণায় আরও একটি চমকপ্রদ উপাদান পাওয়া গেছে CIRBP নামের একটি প্রোটিন, যার পূর্ণরূপ cold-inducible RNA-binding protein। মানুষের শরীরেও এই প্রোটিন আছে, কিন্তু তিমির শরীরে এটি অনেক বেশি সক্রিয় ও কার্যকর। বিজ্ঞানীরা যখন তিমির এই প্রোটিন মানব কোষে যুক্ত করেন, তখন দেখা যায় মানব কোষও ডিএনএ মেরামতে আরও দক্ষ হয়ে উঠছে এবং মিউটেশন কমে যাচ্ছে।
এই আবিষ্কার শুধু তিমির জীববিজ্ঞানের নয়, মানব চিকিৎসাবিজ্ঞানেরও এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। যদি আমরা তিমির এই প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা অনুকরণ করতে পারি, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে ক্যান্সার প্রতিরোধে নতুন থেরাপি তৈরি করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে এটি বার্ধক্য ধীর করার দিকেও নতুন আশা জাগাতে পারে।
এই আন্তর্জাতিক গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টারের ভেরা গোরবুনোভা ও আন্দ্রেই সেলুয়ানোভ এবং অ্যালবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিনের ইয়ান ভিজ। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি, এমডি অ্যান্ডারসন ক্যান্সার সেন্টার, হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলসহ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
তিমির জীববিজ্ঞান আমাদের শেখায়, প্রকৃতি কোনো কিছুকেই অযথা সৃষ্টি করেনি। কোটি বছরের বিবর্তনের ভেতর দিয়ে তিমি এমন এক জিনগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছে যা তাকে ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগ থেকে রক্ষা করে। মানুষের পক্ষে হয়তো এখনই সেই ক্ষমতা অর্জন সম্ভব নয়, কিন্তু এই গবেষণা প্রমাণ করছে প্রকৃতি জানে কিভাবে বাঁচতে হয়, শুধু আমাদের সেই রহস্য বোঝার ধৈর্য রাখতে হবে।