পানি ছাড়া জীবন কল্পনা করা যায় না। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সেই জীবনদায়ী পানিই ধীরে ধীরে মানুষের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এমন সব অণুজীব ছড়িয়ে পড়ছে, যেগুলো আগে শুধু নির্দিষ্ট উষ্ণ এলাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাটি ও পানিতে বসবাসকারী কিছু জীবাণু এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ধরনের হুমকি তৈরি করছে।
সম্প্রতি একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ‘ফ্রি-লিভিং অ্যামিবা’ নামে একদল অণুজীবের কথা উঠে এসেছে। অ্যামিবা হলো এককোষী অণুজীব, যেগুলো স্বাভাবিকভাবেই মাটি, নদী, হ্রদ, পুকুর এবং এমনকি বাসাবাড়ির ট্যাপের পানিতেও থাকতে পারে। অধিকাংশ অ্যামিবা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। তবে কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতি আছে, যেগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং প্রাণঘাতী সংক্রমণের কারণ হতে পারে।
এই বিপজ্জনক প্রজাতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো নেগ্লেরিয়া ফাউলেরি। একে সাধারণভাবে ‘মস্তিষ্কখেকো অ্যামিবা’ বলা হয়। এটি মূলত উষ্ণ ও দূষিত পানিতে বেশি পাওয়া যায়। সাঁতার কাটার সময় বা নাকে পানি ঢুকলে এই অণুজীব মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। মুখ দিয়ে পানি খেলে সাধারণত সমস্যা হয় না, কিন্তু নাক দিয়ে ঢুকলেই বিপদ শুরু হয়।
নেগ্লেরিয়া ফাউলেরি নাকের ভেতরের স্নায়ুপথ ব্যবহার করে সরাসরি মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর এটি মস্তিষ্কের টিস্যু ধ্বংস করতে শুরু করে। এর ফলে মারাত্মক মস্তিষ্কের সংক্রমণ দেখা দেয়, যা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা খুব বেশি নয়, তবে একবার আক্রান্ত হলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি নতুন নয়। ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেশের বিভিন্ন জলাশয়ে এই ধরনের অ্যামিবার উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলাশয়ের তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে এই ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। পৃথিবীর তাপমাত্রা যত বাড়ছে, পানির তাপমাত্রাও তত বাড়ছে। আর উষ্ণ পানি অ্যামিবার বংশবিস্তার করার জন্য সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশ। আগে যেসব শীতপ্রধান দেশে এই জীবাণুর দেখা মিলত না বললেই চলে, এখন সেসব দেশেও অ্যামিবার উপস্থিতি ধরা পড়ছে।
গবেষকদের মতে, ফ্রি-লিভিং অ্যামিবা অত্যন্ত সহনশীল। তারা এমন প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে, যেখানে অনেক ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস বেঁচে থাকতে পারে না। সাধারণত পানি পরিশোধনের জন্য ক্লোরিন ব্যবহার করা হয়, যা বেশিরভাগ জীবাণু ধ্বংস করতে সক্ষম। কিন্তু এই অ্যামিবা ক্লোরিনের মতো শক্তিশালী জীবাণুনাশকের বিরুদ্ধেও টিকে থাকতে পারে।
এই অণুজীবগুলো পানির পাইপলাইন, ট্যাংক এবং স্টোরেজ ব্যবস্থার ভেতরে বাসা বাঁধে। ফলে বাইরে থেকে পানি পরিষ্কার, স্বচ্ছ ও গন্ধহীন মনে হলেও ভেতরে বিপজ্জনক জীবাণু লুকিয়ে থাকতে পারে। এ কারণে শুধু পানির স্বচ্ছতা দেখে নিরাপদ ভেবে নেওয়াটা অনেক সময় ভুল হতে পারে।
গবেষণায় উঠে আসা আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ফ্রি-লিভিং অ্যামিবা শুধু নিজেরাই ক্ষতি করে না, বরং তাদের কোষের ভেতরে অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসকে আশ্রয় দেয়। এই অবস্থায় জীবাণুনাশক পানিতে কাজ করলেও, অ্যামিবার ভেতরে লুকিয়ে থাকা জীবাণুগুলোর ওপর তার প্রভাব পড়ে না। ফলে সেগুলো ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী এবং অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঝুঁকি মোকাবিলায় পানির মান নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ট্যাংক ও পাইপ পরিষ্কার রাখা এবং উষ্ণ পানিতে সাঁতার কাটার সময় সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যত বাড়বে, ততই পানিবাহিত এসব অণুজীব নিয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

