শাওমি ১৭ সিরিজ নিয়ে প্রযুক্তি দুনিয়ায় ইতিমধ্যেই বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে। চীনা এই জনপ্রিয় স্মার্টফোন নির্মাতা কোম্পানি তাদের নতুন ফ্ল্যাগশিপ লাইনআপ সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে বাজারে আনতে পারে। বিভিন্ন প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও লিক তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর দিনটিই হতে পারে এর সম্ভাব্য লঞ্চ তারিখ। সিরিজটিতে তিনটি ফোন অন্তর্ভুক্ত থাকবে শাওমি ১৭, শাওমি ১৭ প্রো এবং শাওমি ১৭ প্রো ম্যাক্স।
এই নতুন সিরিজ নিয়ে গ্রাহকদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হলো এর শক্তিশালী হার্ডওয়্যার ও নতুন কিছু অভিনব ফিচার। ধারণা করা হচ্ছে, পুরো সিরিজেই ব্যবহার করা হবে কোয়ালকমের নতুন প্রজন্মের প্রসেসর স্ন্যাপড্রাগন ৮ এলিট জেন ৫। এই চিপসেটকে বলা হচ্ছে এখন পর্যন্ত তৈরি হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী মোবাইল প্রসেসরের মধ্যে একটি। গেমিং, মাল্টিটাস্কিং বা ভারী অ্যাপ ব্যবহার সব কিছুতেই এটি অসাধারণ পারফরম্যান্স দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শাওমি ১৭ সিরিজে এবার দেখা যাবে কিছু নতুন পরিবর্তন। শাওমি সাধারণত ধারাবাহিকভাবে সিরিজ প্রকাশ করে থাকে, তবে এবার ১৫-এর পর সরাসরি ১৭ সিরিজ আনা হচ্ছে। অর্থাৎ “১৬” নাম্বারটি বাদ দেওয়া হয়েছে। অনেকেই ধারণা করছেন এটি হয়তো কৌশলগত একটি পদক্ষেপ, যাতে নতুন সিরিজটিকে আরও আলাদা করে উপস্থাপন করা যায়।
ক্যামেরা বিভাগে এবার বড় ধরনের উন্নতি আসছে। পুরো সিরিজে লেইকা ব্র্যান্ডের সঙ্গে শাওমির যৌথ উদ্যোগে তৈরি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। লেইকা দীর্ঘদিন ধরেই প্রিমিয়াম ক্যামেরা নির্মাতা হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত। ফলে ছবির গুণগত মান এবং রঙের সঠিকতা নিয়ে ব্যবহারকারীরা বেশ ভালো অভিজ্ঞতা পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে শাওমি ১৭ প্রো মডেলে থাকছে তিনটি ৫০ মেগাপিক্সেল ক্যামেরার সমন্বয় একটি মূল ক্যামেরা, একটি টেলিফটো লেন্স যা সর্বোচ্চ ৫ গুণ পর্যন্ত অপটিক্যাল জুম দিতে পারবে, আরেকটি আলট্রা-ওয়াইড ক্যামেরা। অর্থাৎ ছবি তোলার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে ব্যবহারকারীরা উন্নত অভিজ্ঞতা পাবেন।
ডিসপ্লের দিক থেকেও শাওমি এবার বেশ কিছু পরিবর্তন আনছে। শাওমি ১৭ প্রোতে থাকতে পারে ৬.৩ ইঞ্চির এলটিপিও স্ক্রিন, যার রিফ্রেশ রেট হবে ১২০ হার্টজ। ফলে ভিডিও দেখা, গেম খেলা কিংবা সাধারণ ব্রাউজিং সব কিছুতেই ডিসপ্লে মসৃণ ও আরামদায়ক মনে হবে। স্ক্রিনের চারপাশে খুব পাতলা বেজেল ব্যবহার করা হবে, যা মাত্র ১.১ মিলিমিটার হতে পারে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা প্রায় বেজেল-লেস ডিসপ্লের অভিজ্ঞতা পাবেন।
ব্যাটারির ক্ষেত্রেও শাওমি এবার চমক দেখাতে যাচ্ছে। ৬,৩০০ এমএএইচ ক্ষমতার বড় ব্যাটারি যুক্ত হতে পারে শাওমি ১৭ প্রোতে। এর সঙ্গে থাকবে ১০০ ওয়াট তারযুক্ত ফাস্ট চার্জিং সুবিধা। এত বড় ব্যাটারি থাকার কারণে ব্যবহারকারীরা দীর্ঘক্ষণ ফোন ব্যবহার করতে পারবেন এবং দ্রুত চার্জ দেওয়ার সুবিধা থাকায় ব্যাটারি শেষ হয়ে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে যাবে।
ফোনটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য ফিচার হলো এর সুরক্ষা ব্যবস্থা। শাওমি ১৭ প্রোতে থাকতে পারে আইপি৬৯ রেটিং, যা ফোনকে ধুলোবালি ও পানির ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে। অনেক সময় ফোন দুর্ঘটনাবশত পানিতে পড়ে গেলে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এই সুরক্ষা থাকায় ব্যবহারকারীরা আরও নিশ্চিন্তে ফোন ব্যবহার করতে পারবেন।
শাওমির নতুন আরেকটি উদ্ভাবন হলো “ম্যাজিক ব্যাক স্ক্রিন”। এটি ফোনের পেছনে ক্যামেরা মডিউলের মধ্যে বসানো একটি ছোট ডিসপ্লে। এই সেকেন্ডারি স্ক্রিনে কল আসলে নোটিফিকেশন দেখা যাবে, এমনকি মিউজিক কন্ট্রোল বা টাইমারের মতো ছোট ছোট উইজেটও ব্যবহার করা যাবে। অনেকেই মনে করছেন, এই ফিচারটি ফোনটিকে অন্য ব্র্যান্ডের ফ্ল্যাগশিপ মডেল থেকে আলাদা করবে।
শাওমি ১৭ সিরিজে সফটওয়্যার হিসেবে থাকবে হাইপারওএস ৩, যা অ্যান্ড্রয়েড ১৬-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। শাওমির নিজস্ব এই কাস্টম অপারেটিং সিস্টেমে আগের চেয়ে উন্নত ইন্টারফেস ও দ্রুত পারফরম্যান্স পাওয়া যাবে। নিরাপত্তা ও প্রাইভেসির ক্ষেত্রেও শাওমি এবার আরও উন্নত সুবিধা যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসছে। শাওমি ১৭ সিরিজে ব্যবহার করা হতে পারে আল্ট্রাসনিক ইন-ডিসপ্লে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর। এটি সাধারণ অপটিক্যাল সেন্সরের তুলনায় অনেক দ্রুত ও নির্ভুলভাবে কাজ করে। ফলে ব্যবহারকারীরা আরও আরামদায়ক অভিজ্ঞতা পাবেন।
যারা ভিডিও রেকর্ডিংয়ে আগ্রহী, তাদের জন্যও শাওমি ১৭ প্রো হতে পারে চমৎকার একটি পছন্দ। লেইকা ক্যামেরা এবং উন্নত ইমেজ প্রসেসিং প্রযুক্তির কারণে ভিডিওর গুণগত মান হবে অনেক ভালো। অনেকেই ধারণা করছেন ৮কে ভিডিও রেকর্ডিং সুবিধাও যুক্ত থাকতে পারে।
বাজারের দিক থেকেও এই সিরিজ গুরুত্বপূর্ণ। শাওমি বরাবরই তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে শক্তিশালী ফ্ল্যাগশিপ ফোন এনে আলোচনায় থাকে। যদিও দাম নিয়ে এখনও সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে এই সিরিজ অন্যান্য ব্র্যান্ডের ফ্ল্যাগশিপ ফোনের তুলনায় কিছুটা কম দামে পাওয়া যাবে। এতে করে ক্রেতাদের মধ্যে চাহিদা অনেক বেশি হতে পারে।
শাওমির নতুন এই ফোনগুলো বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বড় ব্যাটারি, উন্নত গেমিং পারফরম্যান্স, চমৎকার ডিসপ্লে এবং লেইকা ক্যামেরা সব মিলিয়ে শাওমি ১৭ সিরিজ বাজারে এলে প্রযুক্তি দুনিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শাওমি ১৭ সিরিজ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে এখনই ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। লঞ্চের আগে যতই নতুন তথ্য বের হচ্ছে, ততই কৌতূহল বাড়ছে। যদি সব তথ্য সত্যি হয়, তাহলে শাওমি ১৭ সিরিজ শুধু চীনে নয়, বৈশ্বিক বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ফোনটি উন্মোচিত হলে এর আনুষ্ঠানিক দাম ও বৈশ্বিক রিলিজ প্ল্যান জানা যাবে।
