এই গ্রীষ্মে কেরি ডানস্টান ও তার সঙ্গী নতুন একটি ইলেকট্রিক গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেন। গাড়ি কেনার সময় তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল – “ব্যাটারিটা কেমন?”
তারা খুঁজে পান ২০২১ সালের একটি Nissan Leaf, যার মাইলেজ মাত্র ২৯,০০০ মাইল। ডিলার জানায়, গাড়ির ব্যাটারির অবস্থা বা স্টেট অব হেলথ (SOH) এখনো প্রায় ৯৩%। এটা শুনে তারা গাড়িটি কিনে ফেলেন। প্রায় ১২,৫০০ পাউন্ড মূল্যে তারা পেলেন প্রশস্ত, আরামদায়ক একটি ইলেকট্রিক গাড়ি।
তবে ডানস্টান, যিনি পেশায় কাঠমিস্ত্রি এবং আরও একটি আধুনিক ভলভো ইলেকট্রিক SUV ব্যবহার করেন, স্বীকার করেন যে লিফটি তার কাছে খুব “রোমাঞ্চকর” লাগেনি। তিনি বলেন, “আমি স্পোর্টি আর ঝলমলে গাড়ি পছন্দ করি। এই লিফটা একটু সাধারণ ধরনের।”
তবুও তিন মাসের ব্যবহারে গাড়িটি প্রত্যাশামতোই পারফর্ম করছে বলে জানান তিনি।
আগে ব্যবহৃত গাড়ি কেনার সময় ক্রেতারা সাধারণত গাড়ির বয়স আর মাইলেজ দেখতেন। কিন্তু এখন ইলেকট্রিক গাড়ির যুগে সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো ব্যাটারির অবস্থা।
কারণ ব্যাটারি হচ্ছে ইভির হৃদপিণ্ড। আগের মালিক কীভাবে ব্যাটারি ব্যবহার করেছেন, কতবার ফাস্ট চার্জ করেছেন, কিংবা সবসময় ১০০% চার্জ দিতেন কিনা এসবের ওপর নির্ভর করে ব্যাটারির আয়ু। ঘন ঘন ১০০% চার্জ করা ব্যাটারির কর্মক্ষমতা দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে।
এই কারণেই অনেক ক্রেতা ব্যবহৃত ইভি কেনার আগে দোটানায় পড়েন। তবে ব্যাটারি বিশ্লেষণকারী কিছু প্রতিষ্ঠান এখন এমন প্রযুক্তি তৈরি করেছে যা পুরনো গাড়ির ব্যাটারির প্রকৃত অবস্থা খুব নির্ভুলভাবে দেখাতে পারে।
অস্ট্রিয়া-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান Aviloo বলছে, তারা ব্যাটারির স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারে। কোম্পানির প্রোডাক্ট অফিসার প্যাট্রিক শাবুস বলেন, “আমরা ব্যাটারির বাস্তব অবস্থাটা নির্ভুলভাবে জানাতে পারি, যা গাড়ির বিল্ট-ইন সিস্টেম থেকেও অনেক বেশি সঠিক।”
Aviloo দুই ধরনের পরীক্ষা করে।
প্রথমটি হলো প্রিমিয়াম টেস্ট, যেখানে গাড়ির মালিক একটি ছোট ডিভাইস গাড়িতে লাগিয়ে কয়েকদিন চালান। এই সময় ব্যাটারিটি ১০০% থেকে ১০% পর্যন্ত নামানো হয় এবং ডিভাইসটি ব্যাটারির পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করে।
দ্বিতীয়টি হলো ফ্ল্যাশ টেস্ট, যা দুই মিনিটেরও কম সময়ে করা যায়। এতে আরেকটি ছোট যন্ত্র গাড়ির ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম থেকে তথ্য নিয়ে কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে বিশ্লেষণ করে।
অ্যাভিলুর প্রধান নির্বাহী মার্কাস বার্গার বলেন, “আমাদের বিশ্লেষণ অনেক সময় গাড়ির নিজস্ব সিস্টেমের SOH রিপোর্টের চেয়ে আলাদা হয়।” তিনি আরও বলেন, “৮০% এর নিচে SOH মানে এই নয় যে ব্যাটারি খারাপ। দামটা উপযুক্ত হলে সেই গাড়িও ভালো কেনা হতে পারে।”
নিউজিল্যান্ডের লুসি হকক্রফটও একটি ব্যবহৃত Nissan Leaf কিনেছিলেন। ডিলার তাদের জানিয়েছিল ব্যাটারির অবস্থা প্রায় ৯৫%। কিন্তু এক বছর পর স্বাধীন এক মেকানিক সেটা পরীক্ষা করে দেখেন, মান কিছুটা নেমে গেছে।
“আমার স্বামী একটু চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন,” বলেন লুসি। তবে তিনি জানান, গাড়িটি এখনো সম্পূর্ণ চার্জে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার চলে, যা তাদের দৈনন্দিন ছোট যাত্রার জন্য যথেষ্ট। “আমাদের কিছু বন্ধুদের গাড়ি একবারে ৪০০ কিলোমিটার যায়, সেটাই আদর্শ,” তিনি বলেন হাসতে হাসতে।
যুক্তরাজ্যের চেল্টেনহামের Cleevely Electric Vehicles নামের কোম্পানির বিক্রয় পরিচালক ডেভিড স্মিথ বলেন, ব্যবহৃত ইভি বিক্রির সময় ব্যাটারি রিপোর্ট এখন ক্রেতাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা।
তিনি বলেন, “আমাদের গ্রাহকরা ব্যাটারির অবস্থা জানতে চান। আমরা ClearWatt নামের একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট দিই। এতে আমরা কোনো পরিবর্তন করতে পারি না।”
“যখন ক্রেতারা রিপোর্টটা দেখেন, তখন ১০ জনের মধ্যে ৯ জন গাড়িটি কিনে ফেলেন,” বলেন স্মিথ।
কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ম্যাট ক্লিভেলি যোগ করেন, “প্রয়োজনে পুরো ব্যাটারি না বদলে কিছু সেল বা মডিউল বদল করলেই কাজ হয়ে যায়। এতে অনেক খরচ বাঁচে।”
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সিমোনা অনোরি বলেন, “বারবার ফাস্ট চার্জ করাও ঠিক নয়, আবার একেবারে এড়িয়ে চলাও নয়। এই দুইয়ের মাঝামাঝি একটি সঠিক ভারসাম্য রাখা দরকার।”
তিনি আরও বলেন, “এই বিষয়ে এখনো বিস্তারিত গবেষণা হয়নি, তবে ব্যাটারির যত্নে সচেতন হওয়া জরুরি।”
গত কয়েক বছরে ব্যাটারি প্রযুক্তিতে ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান CRU-এর ব্যাটারি বিশেষজ্ঞ ম্যাক্স রেইড বলেন, “আগে পুরনো ব্যাটারি ৫০০ থেকে ১,০০০ চার্জ সাইকেল পর্যন্ত টিকত। এখন নতুন ব্যাটারিগুলো ১০,০০০ সাইকেল পর্যন্ত চলতে পারে।”
অন্যদিকে, পুরনো ব্যাটারিগুলোও একেবারে অকাজের নয়। যুক্তরাজ্যের ডরসেটে অবস্থিত Second Life EV Batteries নামের প্রতিষ্ঠান পুরনো ইভি ব্যাটারি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক পল চাউন্ডি বলেন, “অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের পুরনো ব্যাটারি দিয়ে বিদ্যুৎ জমা রাখে, যাতে পরে কাজে লাগানো যায়। যেমন, কোনো প্রতিষ্ঠানের ছয়টি ইলেকট্রিক ফর্কলিফট আছে, কিন্তু চার্জিং সংযোগ মাত্র তিনটির জন্য। তখন তারা পুরনো ব্যাটারিগুলো ব্যবহার করে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতিটি গাড়ি নির্মাতা তাদের নিজস্বভাবে SOH রিপোর্ট তৈরি করে। তাই এই বিষয়ে একটি সাধারণ মানদণ্ড থাকা উচিত।”
সব মিলিয়ে বলা যায়, ব্যবহৃত ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি নিয়ে সন্দেহ এখন অনেকটাই কমছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্লেষণ পদ্ধতির কারণে এখন সহজেই জানা যায়, কোন ব্যাটারি কতটা ভালো অবস্থায় আছে।
কেরি ডানস্টানের মতো অনেক ক্রেতাই এখন বুঝতে পারছেন পুরনো ইভি মানেই খারাপ নয়। সঠিক তথ্য, নির্ভুল রিপোর্ট আর একটু সচেতনতা থাকলে ব্যবহৃত ইলেকট্রিক গাড়িও হতে পারে সাশ্রয়ী ও বুদ্ধিমানের পছন্দ।
