বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন এক নতুন দৃশ্য চোখে পড়ে যা এক দশক আগেও ভাবা যেত না। এখন অনেক শিক্ষার্থী ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকে, চোখ নিবদ্ধ স্ক্রিনে। মনে হয় বই-খাতা নয়, স্ক্রিনই এখন তাদের শিক্ষার প্রধান মাধ্যম। আর এই স্ক্রিনের আড়ালে কাজ করছে এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI।

শিক্ষায় AI নিয়ে আলোচনা নতুন নয়, তবে এখন তা আরও গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ এসব টুল আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ও সহজলভ্য হয়েছে। এখন শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কাজে AI ব্যবহার করছে রচনা লেখার জন্য ChatGPT, প্রেজেন্টেশন তৈরির জন্য Tome.ai বা অন্য অ্যাপ্লিকেশন। AI এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর উপস্থিতি দেখা যায়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কি তাদের পড়াশোনায় AI ব্যবহার করা উচিত?

অদৃশ্য সহায়তা

বিইউপি-র প্রথম বর্ষের ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী ইশিকা নিয়মিতভাবে AI ব্যবহার করে। সে বলে, “AI আমাকে রচনা লিখতে, ধারণা বের করতে বা ব্যাকরণ ঠিক করতে সাহায্য করে। এটা যেন এক ব্যক্তিগত টিউটরের মতো।”

ইশিকার মতো আরও অনেক শিক্ষার্থী এখন AI ব্যবহার করছে। EduCause-এর এক জরিপে দেখা গেছে, গত এক বছরে প্রায় ৬০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তাদের পাঠ্যকাজে AI ব্যবহার করেছে। শুধু লেখালেখিই নয়, পদার্থবিজ্ঞান, গণিত বা প্রকৌশল সমস্যার সমাধানেও তারা এটি ব্যবহার করছে।

বিইউপি-র ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষক মো. নাফিজুর রহমান বলেন, “AI শেখার ঘাটতি পূরণে সাহায্য করতে পারে। এটি শিক্ষার্থীর দুর্বল জায়গা শনাক্ত করে সেই অংশে বাড়তি সহযোগিতা দিতে পারে। এটি শিক্ষককে প্রতিস্থাপন করার জন্য নয়, বরং শিক্ষার অভিজ্ঞতাকে আরও ব্যক্তিগত ও কার্যকর করার জন্য।”

শিক্ষকেরা যদি সঠিকভাবে AI ব্যবহার করতে পারেন, তবে তারা তাদের পাঠ্যবিষয় আরও আধুনিক, প্রাসঙ্গিক ও আকর্ষণীয় করতে পারবেন। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে AI-নির্ভর শিক্ষাদান সৃজনশীলতা, দলগত কাজ এবং সমন্বয় বাড়াতে সাহায্য করবে।

সুবিধা ও ঝুঁকি

তবে সবাই AI ব্যবহার নিয়ে আশাবাদী নয়। প্রযুক্তির প্রতিটি দিকের মতো এটিও দুইধারার তলোয়ার। AI যেমন সুবিধা দেয়, তেমনি ঝুঁকিও তৈরি করে। তথ্যের গোপনীয়তা, ভুল তথ্য, প্রযুক্তিগত বৈষম্য এবং শিক্ষায় মানবিক সম্পর্ক হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা নিয়ে অনেকে চিন্তিত।

কেউ কেউ মনে করেন, AI-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী ও চিন্তাশক্তি কমিয়ে দিতে পারে, কারণ তারা নিজেরা চিন্তা না করে মেশিনের ওপর নির্ভর করবে। নাফিজুর রহমানও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় হলো ব্যক্তিত্ব গঠনের স্থান। AI পারফরম্যান্স বাড়াতে পারে ঠিকই, কিন্তু এটি আমাদের ভাবার ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা দুর্বল করে দিতে পারে।”

সবচেয়ে বড় ভয় হলো AI-এর যুগে আমরা যেন শিক্ষার মানবিক দিকটি হারিয়ে না ফেলি। শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা কেবল তথ্য বিনিময় নয়; এটি আলোচনার, মতবিনিময়ের এবং অনুভূতির জায়গা। শিক্ষা মানে সহানুভূতি শেখা, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা, যোগাযোগ দক্ষতা তৈরি করা এবং সুন্দরভাবে নিজেকে প্রকাশ করা। এই মানবিক উপাদানগুলোই শিক্ষা সম্পূর্ণ করে, যা কোনো প্রযুক্তি পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারে না।

বিইউপি-র সহযোগী অধ্যাপক ড. জিয়াউর রহমান বলেন, “AI শেখায় সাহায্য করতে পারে, কিন্তু মানবিক দিকটা যেন হারিয়ে না যায়। শিক্ষা কেবল তথ্য বা হিসাব শেখা নয়, এটি মানবিকতা ও আবেগ বোঝার বিষয়ও।”

প্রযুক্তিগত বৈষম্য

AI ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তিগত বৈষম্য বা ডিজিটাল বিভাজন। বাংলাদেশের সব শিক্ষার্থী সমান সুযোগে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে না। অনেকের কাছে ভালো ইন্টারনেট, আধুনিক ডিভাইস বা সঠিক প্রশিক্ষণ নেই।

নাফিজুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশে এখনো অনেক শিক্ষার্থী প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে AI পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত করার আগে আমাদের ভাবতে হবে, সবাই কি সমানভাবে উপকৃত হতে পারবে?” তার মতে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় AI সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে আরও ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগবে।

ভারসাম্যের প্রয়োজন

AI এখন বাস্তবতা, একে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমন ভারসাম্য খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে AI শেখার সহায়ক হবে, প্রতিস্থাপন নয়। প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের স্বার্থ বিবেচনা করে প্রশ্ন হওয়া উচিত, “এটি শেখার প্রক্রিয়ায় কতটা সহায়তা করছে, এবং শিক্ষকেরা এটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারছেন কি না?”

AI যেন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাকে পরিপূরক করে, প্রতিদ্বন্দ্বী নয় এই মানসিকতা নিয়ে এগোতে হবে। শিক্ষকদেরও প্রয়োজন নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বোঝা, যাতে AI শিক্ষার্থীদের নির্ভরশীল না করে, বরং চিন্তাশীল করে তোলে।

ভবিষ্যতের প্রস্তুতি

আজকের বিশ্বে AI জ্ঞান আর বিলাসিতা নয়, এটি প্রয়োজনীয়তা। ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে টিকে থাকতে শিক্ষার্থীদের মৌলিক AI ধারণা থাকা দরকার, যে বিষয়ে তারা পড়ুক না কেন।

AI শেখা মানে শুধু সফটওয়্যার চালানো নয়; এর নৈতিক দিক, সামাজিক প্রভাব এবং সীমাবদ্ধতাও বোঝা জরুরি।

নাফিজুর রহমান বলেন, “শিক্ষকদের কাজ শুধু শিক্ষার্থীদের চাকরির জন্য প্রস্তুত করা নয়, বরং তাদেরকে দায়িত্বশীল ও নৈতিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। AI শেখাতে হবে, কিন্তু সেই সঙ্গে শেখাতে হবে সততা ও বিবেকবোধ।”

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই ভূমিকা পালনে সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। এখানেই শিক্ষার্থীদের শেখানো যায় কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে দায়িত্বশীলভাবে, যেন তারা AI-কে শুধু টুল হিসেবে নয়, এক শিক্ষণীয় মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।

AI ও মানবিকতার সহাবস্থান

AI শিক্ষার প্রক্রিয়ায় এক বিপ্লব এনে দিয়েছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এটি যেন শিক্ষার মানবিক দিককে মুছে না দেয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের চিন্তা, বিশ্লেষণ ও সৃজনশীলতার জায়গা যেন সংকুচিত না হয়।

AI ব্যবহার মানেই শেখাকে সহজ করা, তবে এটি যেন অলসতা না বাড়ায়। শিক্ষার্থীদের উচিত AI-এর সাহায্য নেওয়া, কিন্তু নিজস্ব চিন্তা বজায় রাখা।

শিক্ষকরাও AI-কে ব্যবহার করতে পারেন একটি সহযোগী হিসেবে প্রশ্ন তৈরিতে, পাঠ্যসামগ্রী হালনাগাদে, বা শিক্ষার্থীর দুর্বলতা নির্ধারণে। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানবিক বিচার-বুদ্ধিই হওয়া উচিত মূল নিয়ামক।

ভবিষ্যতের পথচলা

AI এখন এমন এক বাস্তবতা, যা থেকে সরে থাকা সম্ভব নয়। তাই এখন সময় এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এটি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করার। নীতি নির্ধারক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একসাথে বসে ভাবতে হবে কীভাবে AI ব্যবহার করা যায় যাতে এটি শেখাকে আরও কার্যকর করে তোলে, কিন্তু মানবিক গুণাবলিকে ক্ষুণ্ণ না করে।

প্রযুক্তি মানুষের বিকল্প নয়, বরং সহায়ক। সঠিক দিকনির্দেশনা ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের মাধ্যমে AI হতে পারে শিক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী সহচর।

আমরা যদি সততা ও সচেতনতার সঙ্গে এটি ব্যবহার করি, তবে AI শুধু পড়াশোনার পদ্ধতি বদলাবে না, বরং আমাদের চিন্তা, শেখা ও সৃষ্টিশীলতার জগৎকেও প্রসারিত করবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version