“এই দেশের অনেক কাজই আসলে মানুষের করার মতো নয়। সারাদিন ফ্যাক্টরিতে কাজ করা বা প্রচণ্ড গরমে মাঠে শ্রম দেওয়া এসব শুধু টিকে থাকার লড়াই, মানুষের জন্য সম্মানজনক কাজ নয়,”-বলেছেন বিশ্ববিখ্যাত ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট বিনোদ খোসলা তার সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে। তিনি মনে করেন, মানুষ কাজ হারালেও জীবনের উদ্দেশ্য হারাবে না।
এই মন্তব্য এসেছে এমন সময়ে, যখন বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নিয়ে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে। কেউ এই প্রযুক্তিকে আশার আলো হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ ভয় পাচ্ছেন এটি মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে।
খোসলা কথা বলেছেন TechCrunch Disrupt 2025 অনুষ্ঠানে, যেখানে তিনি ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, AI আসন্ন সময়ে প্রায় সব পেশাতেই বড় পরিবর্তন আনবে এবং একইসঙ্গে এমন ব্যবস্থা দরকার হবে যাতে কাজ হারানো মানুষদেরও এর সুফল দেওয়া যায়।
৭০ বছর বয়সী খোসলা ২০১৮ সালে OpenAI-তে ৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। তার মতে, প্রতিটি পেশাই এখন এক একটি নতুন সুযোগ। তিনি বলেন, “প্রতিটি পেশার জন্য একটি AI সংস্করণ তৈরি করা সম্ভব। যেমন -AI ডাক্তার, AI ইঞ্জিনিয়ার, AI হিসাবরক্ষক, AI মার্কেটার সবই সম্ভব।”
তবে তিনি উদ্যোক্তাদের সতর্ক করে বলেন, “বড় বড় কোম্পানির মডেলগুলো এত দ্রুত উন্নত হচ্ছে যে অনেক নতুন স্টার্টআপ তৈরি হওয়ার আগেই অচল হয়ে যাচ্ছে।”
বিনিয়োগের নতুন ধারা
খোসলা জানান, তার প্রতিষ্ঠান এখন এমন AI তৈরি করছে যা সরাসরি মানুষের কাজ করতে পারবে। “আমরা আগে এমন টুল তৈরি করতাম যা মানুষকে সাহায্য করবে, এখন এমন AI তৈরি করছি যা পুরো কাজটাই করতে পারে,” তিনি বলেন। তার মতে, “যদি AI এমন কোনো কাজ করতে পারে যার জন্য একজন মানুষকে বছরে কয়েক লাখ ডলার বেতন দিতে হয়, তাহলে সেটাই বেশি মূল্যবান।”
Fortune 500 কোম্পানির ভবিষ্যৎ
খোসলা বিশ্বাস করেন, আগামী এক দশকের মধ্যেই Fortune 500 কোম্পানিগুলোর বড় অংশ বিলুপ্ত হবে। তার ভাষায়, “২০৩৫ সালের মধ্যে কোম্পানিগুলো তিন গুণ দ্রুত গতিতে তালিকা থেকে বেরিয়ে যাবে। নতুন উদ্যোক্তারা তাদের জায়গা দখল করবে, কারণ পুরোনো কোম্পানিগুলো পরিবর্তনকে সময়মতো বুঝতে পারছে না।”
তিনি বলেন, এই পরিবর্তনে অনেক মানুষ চাকরি হারাবে। তবে তার একটি সাহসী প্রস্তাব হলো প্রতিটি বড় কোম্পানির ১০ শতাংশ মালিকানা একটি জাতীয় তহবিলে রাখা উচিত, যা সাধারণ মানুষের জন্য ব্যবহার হবে। তিনি আরও বলেন, “যদি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের বেশি হয়, সেই অতিরিক্ত অংশ বেকার মানুষদের জন্য সঞ্চয় করা উচিত, ঠিক যেমন আলাস্কার তেল তহবিল।”
তার মতে, “২০৩৫ সালের মধ্যে অর্থনীতি এমন অবস্থায় যাবে যেখানে সবকিছু সস্তা হবে, উৎপাদন বাড়বে এবং সবাই প্রাচুর্যে থাকবে। তখন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আইনি পরামর্শ বিনামূল্যে দেওয়া সম্ভব হবে।”
AI ও জ্বালানির ব্যয়
AI প্রযুক্তি নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একটি ChatGPT উত্তর তৈরি করতে যত শক্তি লাগে, তা আসলে একটি Google সার্চের সমান।”
তিনি আরও জানান, তার বিনিয়োগকৃত কোম্পানি Mazama একটি নতুন ধরনের ভূ-তাপীয় কূপ তৈরি করেছে, যা একক সাইট থেকেই ৫ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। খোসলার ভাষায়, “৪৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় আমরা প্রতিটি কূপ থেকে ১০ গুণ বেশি শক্তি পাই।” Mazama ২০২৭ সালেই প্রথম গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে।
শেষে খোসলা বলেন, “ভবিষ্যতে মানুষ এমন কাজে সময় দেবে যা তাদের আনন্দ দেবে। সাধারণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো AI করে দেবে। মানবজাতি তখন সত্যিকারের সৃজনশীল যুগে প্রবেশ করবে।”
